টাকা
টাকা

টাকা ছাপাতে থাকলে মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে

বাংলাদেশের মতো ঘাটতি বাজেটের দেশে সরকারকে টাকা ধার করে চলতে হয়। আর সেই ধার বা ঋণ দেশি–বিদেশি যেকোনো উৎস থেকেই হতে পারে। সরকার আগে খরচ করে, এরপর টাকার সংস্থান করে। নতুন সরকারকে এখন আগের সরকারগুলোর যেনতেন প্রকল্পের খরচের জেরও টানতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের আয়ের একমাত্র উৎস রাজস্ব খাত, কিন্তু রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। দেশের ব্যবসা–বাণিজ্যের পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়। তাই রাজস্ব আয় বাড়বে, সে আশা করা কঠিন।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সুদ ব্যয়, ভর্তুকি ও চলমান প্রকল্প ব্যয় মেটাতে সরকারকে প্রতিনিয়ত ঋণ করতে হচ্ছে। এদিকে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ব্যাংক খাতের পাশাপাশি মাঝেমধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিতে হচ্ছে। আর টাকা ছাপিয়ে ঋণ করা মানে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি পাওয়া, যা ‘হাই পাওয়ার মানি’ নামে পরিচিত। এক টাকা ছাপালে বাজারে পাঁচ টাকা পর্যন্ত তৈরি হয়। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এমনিতে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাপে আছে মানুষ। এখন আবার নতুন চাপ যোগ হচ্ছে।

সীমার বেশি ঋণ সরকারের

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। গত বছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার মোট ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার (গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ঋণ নিয়েছিল ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ৫২ দিনে নতুন সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো অর্থবছরের বাজেটীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি অর্থবছরের এখনো আড়াই মাস বাকি। তাই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সরকার আরও ঋণ করলে বেসরকারি খাত চাঙা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিমধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকায়। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।

কত টাকা ছাপাল সরকার

সরকারের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজস্ব আয় ও ঋণ পেলে তা সরকারের হিসাবে জমা হয়। সরকারের চাহিদামতো বেতন-ভাতা, ঋণ ও সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রকল্প খরচের জন্য ঠিকাদারদের সেই হিসাব থেকে বিল পরিশোধ করা হয়। মাঝেমধ্যে সরকারের সেই হিসাব শূন্য হয়ে পড়ে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফট দুটি হিসাবে ১২ হাজার কোটি করে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের সীমা দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের স্বল্পমেয়াদি অগ্রিম ঋণ নেওয়াই হচ্ছে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স। সরকার যখন সাময়িকভাবে টাকার ঘাটতিতে পড়ে, অর্থাৎ রাজস্ব আসার আগেই খরচ মেটানোর দরকার পড়ে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে খুব অল্প সময়ের জন্য ঋণ নেয় সরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাসের শুরুতে সরকারের কিছু বড় খরচ আছে, যেমন কর্মচারীদের বেতন, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিল পরিশোধ ইত্যাদি। এ ধরনের ব্যয় মেটাতে সরকার স্বল্প সময়ের জন্য এ ঋণ নেয়। একই কারণে ওভারড্রাফটের মাধ্যমেও ঋণ নেওয়া হয়।

সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা তৈরি বা ‘মানি ক্রিয়েশন’-এর আশ্রয় নেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওয়েজ অ্যান্ড মিনস হিসাবে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হলেও ওভারড্রাফট ঋণ পৌঁছেছে ২২ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকায়। এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিয়েছিল। যেটা এখন দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ১৩২ কোটি টাকায়। ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা।

টাকা ছাপালে কী হয়

একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত সেই দেশের মোট জিডিপি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টাকা ছাপায়। দেশের ভেতরে পণ্য ও সেবা উৎপাদন যে হারে বাড়ে, তার সঙ্গে মিল রেখে টাকা ছাড়া হলে অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে। সীমার বেশি টাকা ছাপালে ও পণ্যের উৎপাদন না বাড়লে মানুষের হাতে টাকা বেড়ে যায়। এতে পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু জোগান সীমিত থাকে। ফলে হু হু করে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়া বাজারে টাকার সরবরাহ কৃত্রিমভাবে বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে যায়। এতে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। নতুন ছাপানো টাকা যখন বাজারে ঘুরে, তখন তা বাজারে পাঁচ গুণ বেশি ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করে, যা বাজারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অতিরিক্ত টাকা ছাপানো অনেকটা তরল দুধে জল মেশানোর মতো। পরিমাণ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু ঘনত্ব বা পুষ্টিগুণ কমে যায়।

তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত, সরকারকে সরাসরি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। কারণ, মুদ্রার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব। সরকারকে টাকা ছাপিয়ে ধার দেওয়া সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অস্বস্তির দিকে ঠেলে দেয় এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলে। এখনই সময় এদিকে নজর দেওয়ার।