
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিং-২০২৪ এ স্থান করে নিয়েছে বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় যমুনা ব্যাংক। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিং তালিকায় স্থান করে নিয়েছে যমুনা ব্যাংক। কোন কোন সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই রেটিং করা হয়?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিং একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন কাঠামো, যার মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলো টেকসই অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা পরিমাপ করা হয়। যমুনা ব্যাংক মনে করে, এই রেটিং শুধু একটি স্বীকৃতি নয়; বরং আমাদের দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যৎমুখী ব্যাংকিংয়ের প্রতিফলন। টেকসই রেটিং পাঁচটি মূল সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে—সাসটেইনেবল ফিন্যান্স ইনডেক্স বা টেকসই অর্থায়ন সূচক, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, কোর ব্যাংকিংয়ের টেকসই সূচক ও ব্যাংকিং সেবার বিস্তৃতি। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখা, হিসাব খোলা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ—এই সূচকগুলোর মাধ্যমে একটি ব্যাংকের আর্থিক কার্যক্রম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবা ও সামাজিক অবদানকে সম্মিলিতভাবে পরিমাপ করে টেকসই রেটিং নির্ধারণ করা হয়। যমুনা ব্যাংক এসব সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতি ও দক্ষতা দেখিয়ে এই তালিকায় নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
এর মধ্যে কোন সূচকে আপনাদের অবস্থান কী ছিল?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ: যমুনা ব্যাংক ২০২৪ অর্থবছরে টেকসই ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন সূচকে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই অর্জন আমাদের টেকসই রেটিংয়ে এগিয়ে থাকতে সাহায্য করেছে। আমাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৯১ দশমিক ৩৭ শতাংশই টেকসই খাতে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা ২০ শতাংশ। এর মধ্যে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের হার ছিল ৩৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, এ খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ। এ ছাড়া পুরো ব্যাংক খাতে যেখানে ঋণখেলাপি ২০ শতাংশ, সেখানে যমুনা ব্যাংকের খেলাপি ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। এই শক্তিশালী পারফরম্যান্স আমাদের দেশের অন্যতম সেরা টেকসই ব্যাংকের তালিকায় স্থান করে নিতে সহায়তা করেছে।
কোন সূচকে আপনারা ভালো করছেন বলে মনে করেন?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ: আমাদের মূল্যায়নে টেকসই অর্থায়ন, কোর ব্যাংকিং সূচক এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যমুনা ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় যমুনা ব্যাংক একটি লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব স্পিনিং মিলের জন্য ১৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা এখন পর্যন্ত কোনো একক গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন।
এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং কৃষি খাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন করছি আমরা। এসব চেষ্টা গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং বিস্তারে অবদান রাখছে। আমাদের খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত, রিটার্ন অন ইক্যুইটিসহ মূল ব্যাংকিং সূচকে দৃঢ় ও স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলা ও ঝুঁকিহীন ব্যবস্থাপনার প্রমাণ।
টেকসই রেটিংয়ে স্থান করে নিতে আপনারা বাড়তি কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ: যমুনা ব্যাংক টেকসই ও জলবায়ুসচেতন ব্যাংকিংকে ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি মনে করে। টেকসই রেটিংয়ে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে আমরা কিছু কৌশলগত উদ্যোগ নিয়েছি, তার মধ্যে পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (ইএসআরএম) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংকের শাখাগুলোতে হেল্পডেস্ক চালু করে গ্রাহকদের টেকসই ঋণ পণ্য ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কাগজবিহীন লেনদেন, ই-স্টেটমেন্ট, ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা হয়েছে, যা শুধু পরিবেশবান্ধব নয় বরং গ্রাহকের জন্য অধিকতর সহজ। ব্যাংকিং সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা ১৬৯টি শাখা, ১১৪টি উপশাখা, ৫৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৩৬৫টি এটিএম ও সিআরএম স্থাপন করেছি।
এই উদ্যোগগুলো ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে কতটা ভূমিকা রাখছে?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ: যমুনা ব্যাংকের গৃহীত টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার নিদর্শন নয়; বরং এগুলো আমাদের ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার দিকেও একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ সাধারণত স্থিতিশীল ও কম ঝুঁকির, এর ফলে খেলাপি ঋণও কমেছে।