
বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, বড় শক্তিগুলো প্রায়ই নীতির ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘অতি উৎপাদন’ ও ‘জোরপূর্বক শ্রম’ নিয়ে যে তদন্ত শুরু করেছে, তা শুধু শ্রম অধিকার বা ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়; বরং এর পেছনে বড় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির মুখে রয়েছে, তা কমানোর চাপ এখন তাদের নীতিনির্ধারণে আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশের ‘অতি সক্ষমতা’ অন্তরায় হয়ে উঠছে।
গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি দ্রুত বেড়েছে, অথচ একই গতিতে রপ্তানি বাড়েনি। দেশটি বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে আছে। যদিও সেবা রপ্তানিতে তাদের উদ্বৃত্ত আছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নানা উপায়ে আমদানি কমানো এবং দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দেওয়ার পথ খুঁজছেন। ‘অতি উৎপাদন’, ‘ডাম্পিং’, ‘জোরপূর্বক শ্রম’ কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলের নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো ক্রমেই বাণিজ্যনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের উৎপাদন ও শ্রমব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটা প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশে জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেও তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মূল কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এমনকি পাল্টা শুল্ক হিসেবে যে অর্থ আদায় করা হয়েছে, তা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট এমন আরও অনেক রায় দিতে পারেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন একরকম মরিয়া হয়ে এই তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ ও মজুরি নিয়ে অনেক সমালোচনা থাকলেও জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন হয়— এমন অভিযোগ কখনো ওঠেনি। অন্যদিকে অতি উৎপাদনের সংজ্ঞা অপরিস্কার। ফলে এসব বিষয়ে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে শক্ত যুক্তি বাংলাদেশের আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত কেবল শ্রম অধিকার বা মানবাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না; বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির বড় প্রবণতার অংশ। শুধু ট্রাম্প প্রশাসন নয়, এর আগেও তারা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে স্ববিরোধী আচরণ করেছে। যখন তারা দেখেছে, উন্নয়নশীল দেশ বেশি লাভবান হচ্ছে, তখন তার রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন নীতিগত ও নৈতিক যুক্তিকে বাণিজ্যিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বাস্তবতা হলো, ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও ‘অতি উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছিল, বিশেষ করে কৃষি ও কিছু শিল্প খাতে তাদের উৎপাদন আধিপত্যের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এসব অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা গেলেও অন্য দেশের বিরুদ্ধে এখন যে ধরনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত (বাংলাদেশসহ ১৬ দেশের বিরুদ্ধে যা হচ্ছে) হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন নিজে তেমন প্রক্রিয়ার মুখে পড়েনি; বরং ১৯৩০-এর যে মহামন্দা, এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অতি উৎপাদনের সম্পর্ক আছে।
১৯২০-এর দশকে যান্ত্রিকীকরণ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতে বড় ধরনের অতি উৎপাদন হয়। উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষিপণ্যের দাম ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। একই সময়ে দ্রুত শিল্পায়নের ফলে গাড়ি ও ভোক্তাপণ্যের মতো খাতে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে স্মুথ হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট পাস করে যুক্তরাষ্ট্র আমদানি শুল্ক প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। উদ্দেশ্য ছিল, অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় দেশীয় বাজারকে সুরক্ষা দেওয়া। বলা যায়, পাল্টা শুল্ক আরোপের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হয় এবং মহামন্দা আরও গভীর হয়।
মহামন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দাম স্থিতিশীল করতে কিছু কৃষিপণ্য নষ্ট করার নীতি গ্রহণ করে। মহামন্দার প্রেক্ষাপটে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের সরকার অ্যাগ্রিকালচার অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যাক্ট প্রণয়ন করে ১৯৩৩ সালে। এই কর্মসূচির আওতায় কিছু তুলাখেত নষ্ট করা, গবাদিপশু জবাই করা ও অতিরিক্ত শস্য বাজারে না আনার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য-উৎপাদন কমিয়ে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ানো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও জাপান অভিযোগ তোলে, যুক্তরাষ্ট্র ভর্তুকি দিয়ে যে গম, ভুট্টা ও মুরগির মাংস অতি উৎপাদন করছে, তা বিদেশে সরবরাহ করে স্থানীয় বাজারে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে অ্যাগ্রিকালচার ট্রেড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট (পিএল-৪৮০)-এর আওতায় খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি চালুর পর এই অভিযোগ আরও বাড়তে শুরু করে। এর একটি আলোচিত উদাহরণ ছিল চিকেন ওয়ার। বিষয়টি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মুরগির মাংস রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধির পর ইউরোপ মুরগির সেই মাংস আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
একই সময়ে ইস্পাত ও যন্ত্রপাতি খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেডের অধীনে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকারখানার সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি ছিল। ইউরোপ তখনো যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের পর্যায়ে ছিল।
এখানেই শেষ নয়, ১৯৭৩ সালের তেলসংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ বিশ্ববাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি করলে ওপেক সদস্যদেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ১৯৮০-এর দশকে টেক্সটাইল খাতেও কিছু সময়ের জন্য একই ধরনের বাজারচাপ তৈরি হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ক আরোপ করে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়তে থাকে এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়—আজ চীনের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা শোনা যায়, তার সঙ্গে এই পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায়।
তবে ১৯৭৫ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বড় বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের দিকে এসে এই ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ফলে আজকের বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আর প্রচলিত অর্থে ‘অতি উৎপাদনের দেশ’ বলা হয় না। উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র এখন সেবা, প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের উদ্ভাবনী খাতের ওপর নির্ভরশীল।
আবার পণ্য বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি থাকলেও সেবা বাণিজ্যের বিপুল উদ্বৃত্ত আছে। সিনহুয়ার তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেবা বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত ৩৩৯ দশশিক ৪৭ বিলিয়ন বা ৩৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। সিএনবিসির তথ্যে জানা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এত পাল্টা শুল্ক আরোপ করলেও কার্যত বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
এখন কথা হচ্ছে, কোনো দেশের বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেই কি সেই দেশ লুজার বা পরাজিত? এ কথা মনে করার কারণ আছে কী? অর্থশাস্ত্র যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা কখনোই সে কথা বলেন না। এটা কাঠামোগত কারণে হয়ে থাকে। যদি এই ঘাটতি বিচক্ষণতার সঙ্গে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তবে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ঘাটতি অবশ্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া যেকোনো দেশ উন্নতির বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন খাতনির্ভর থাকে। যেমন প্রথমে কৃষিনির্ভরতা; এরপর শিল্পনির্ভরতা; এরপর যখন সেই দেশ উন্নতির চরম শিখরে উঠে যায়, তখন সেবা বা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রও সেই কালপর্ব পেরিয়ে এসেছে। পৃথিবীতে আজ যত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, তার সবই প্রায় তাদের তৈরি। এখন চীন সেই পথ ধরছে। ভারত কিছুটা আগেই সেবা বা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ অভিযোগ করেন। উৎপাদন খাতে বিকশিত হওয়ার আগেই তারা সেবা খাতের দিকে এগিয়েছে।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিলকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের প্রায় সব দেশ, তা সে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হোক বা শত্রু, সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে গত ৫০ বছরে অর্থনৈতিকভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা বন্ধ হয়েছে; মানুষের চাকরি গেছে; কিন্তু তিনি আর সেটা হতে দেবেন না। সে কারণে তাঁর পারস্পরিক শুল্ক।
বিশ্বায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই মুক্তবাণিজ্যের ধারণাটি সামনে আসে। তত্ত্বগতভাবে বলা হয়, বাজার উন্মুক্ত হলে পণ্য, সেবা ও পুঁজি অবাধে চলাচল করবে এবং এর ফলে বৈশ্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বাস্তবেও দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকের পর বিশ্বায়ন দ্রুততর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি আরেকটি বৈপরীত্যও দেখা যায়। সেটা হলো, মুক্তবাণিজ্যের কথা বললেও শক্তিশালী অর্থনীতিগুলো প্রায়ই নিজেদের শিল্প ও কৃষিকে সুরক্ষা দিতে নানা ধরনের নীতি গ্রহণ করে।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিৎস (মেকিং গ্লোবালাইজেশন ওয়ার্ক) মনে করিয়ে দেন, বাণিজ্য উদারীকরণ বিশ্বায়নের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাস্তবে কখনো পুরোপুরি মুক্ত ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজার উন্নত দেশের পণ্যের জন্য খুলে দেওয়া হলেও সমানভাবে পাল্টা সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। আবার ছোট দেশগুলো যে তার সুবিধা নেবে, তাদের সেই সক্ষমতা বিকশিত হয়নি। দেখা গেছে, শুল্ক কমনো হলেও মাননিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিডাম্পিং ব্যবস্থা, ভর্তুকি কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার মতো অশুল্ক বাধা রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাণিজ্য উদারীকরণের সুবিধা সব দেশ সমানভাবে পায় না।
এই বৈপরীত্য বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বৃহৎ মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল গড়ে ওঠে। তাত্ত্বিকভাবে ধরা হয়েছিল, এটা মেক্সিকোর জন্য বড় সুযোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেক্সিকোর ক্ষুদ্র কৃষকেরা বড় চাপের মুখে পড়ে। একই সময়ে শুল্ক বাধা কমলেও বিভিন্ন অশুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে মেক্সিকোর পণ্যের প্রবেশ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে যায়। ফলে মেক্সিকোর অর্থনীতি ক্রমেই মার্কিন অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ মুক্তবাণিজ্যের প্রবক্তা হিসেবে নিজেদের দাবি করলেও নবিজের বাজার রক্ষায় সময়-সময় সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেয়। কৃষিতে ভর্তুকি, অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক, মাননিয়ন্ত্রণের কঠোর শর্ত কিংবা শ্রমমানের প্রশ্ন—এসবই অনেক সময় বাণিজ্য নীতির রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র যখন বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে অতি উৎপাদন বা শ্রমমানের অভিযোগ তুলে তদন্ত শুরু করছে, তখন অনেক বিশ্লেষকের মতে, সেটি এই দীর্ঘদিনের সুরক্ষামূলক বাণিজ্য রাজনীতিরই নতুন রূপ।
জোসেফ স্টিগলিৎস মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পৃথকভাবে দেখতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই বিষয়টি উন্নত দেশের মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এই উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত দেশের কথা না শোনে, তাহলে উন্নত দেশগুলো এদের দেওয়া প্রাধিকারমূলক সুযোগ-সুবিধা ফেরত নিতে পারে। বিষয়টি এখন উন্নত দেশগুলোর হাতে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে গেছে।
স্টিগলিত্স বলেন, স্রেফ একটি সংস্কার এর প্রতিকার করতে পারে। সেটা হলো, উন্নত দেশগুলোকে প্রতিদানের আশা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত ছাড়াই স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাজার খুলে দিতে হবে। অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশকেও সে এই সুবিধা দিতে পারবে—এমন বিধানও থাকবে। তবে অন্য উন্নত দেশগুলোকে সে এই সুবিধা দিতে পারবে না। মধ্যম আয়ের দেশগুলোকেও এই কাজ করতে হবে। তবে তারাও উন্নত দেশকে এই সুবিধা দিতে পারবে না, এতে তাদের শিল্পের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ শুধু সমতা নয়, ন্যায়সংগতভাবে প্রাধিকারমূলক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।