
আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজির রয়্যালটি, লাইসেন্স মাশুল ও প্রযুক্তি সহায়তা মাশুলের ওপর করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫৫(ই) সংশোধন করে ‘ব্যবসায়িক টার্নওভারের ৬ শতাংশ অথবা নিট মুনাফার ১৫ শতাংশের মধ্যে যেটি কম’—এই সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলার–সংকট, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও বেকারত্বের চাপ; অন্যদিকে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত সম্প্রসারিত নগর মধ্যবিত্তশ্রেণি ও ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আধুনিক নগর অর্থনীতিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি শুধু একটি ব্যবসায়িক মডেল নয়; এটি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও সেবার মানোন্নয়নের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত—সবখানেই আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি খাত বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো এই সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারেনি।
উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উত্তরণের এই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে আকৃষ্ট করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা হতে পারে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক হাতিয়ার। তবে শুধু বড় বাজার থাকলেই হয় না; বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজন আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করনীতি।
বিশ্বের বড় বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্র্যান্ড, যেমন ম্যাকডোনাল্ডস, স্টারবাকস, কেএফসি, ইউনিক্লো কিংবা সেভেন-ইলেভেন যে দেশে বিনিয়োগ করে, সেখানে তারা শুধু ব্যবসা পরিচালনা করে না; সঙ্গে নিয়ে আসে প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, আধুনিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন সেবাসংস্কৃতি। বাংলাদেশেও এর সম্ভাবনা কম নয়। প্রায় ১৭ কোটির বিশাল ভোক্তা বাজার, দ্রুত বিস্তৃত মধ্যবিত্তশ্রেণি এবং নগরকেন্দ্রিক ভোগসংস্কৃতি আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু করকাঠামোর জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা এখনো অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারীকে নিরুৎসাহিত করছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের তরুণ প্রজন্মের জীবনধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক মানের খাবার, খুচরা বিপণন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড এখন বাংলাদেশের বাজারকে আর উপেক্ষা করে না। তারা আগ্রহী। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই বিনিয়োগ গ্রহণের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত?
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বর্তমান করকাঠামো এখনো বিনিয়োগবান্ধব নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি জটিল, অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা দেখে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ কতটা সহজ, করনীতি কতটা স্থিতিশীল এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ। এ জায়গাতেই বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
একটি আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্র্যান্ড বাংলাদেশে আসতে চাইলে তাকে ভ্যাট, অগ্রিম কর, উৎসে কর, আমদানি শুল্ক, ট্রেড লাইসেন্স, রয়্যালটি কর—নানা স্তরের কর ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। শুধু তা–ই নয়, নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে। ফলে অনেক ব্র্যান্ড বাংলাদেশে প্রবেশের আগ্রহ হারায় অথবা সীমিত পরিসরে ব্যবসা চালায়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডার বিদ্যমান নির্দেশিকা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক টার্নওভারের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি, লাইসেন্স মাশুল, কারিগরি সেবা মাশুল, কারিগরি কৌশল বা কারিগরি সহায়তা বাবদ অর্থ নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে (বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে) তাদের প্যারেন্ট কোম্পানিকে পাঠাতে পারে।
কিন্তু আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫৫(ঙ) এ ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। আইনে বলা হয়েছে, রয়্যালটি, লাইসেন্স মাশুল, কারিগরি সেবা মাশুল, কারিগরি কৌশল বা সহায়তা বাবদ মাশুল এবং স্পর্শাতীত সম্পদ ব্যবহারের বিপরীতে প্রদেয় অন্যান্য সমজাতীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যয় যদি আর্থিক বিবরণীতে প্রদর্শিত ব্যবসায়িক টার্নওভারের ৬ শতাংশ অথবা নিট ব্যবসায়িক মুনাফার ১৫ শতাংশের মধ্যে যেটি কম, সেই সীমা অতিক্রম করে, তাহলে অতিরিক্ত অংশ করযোগ্য আয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে না।
এর ফলে কোনো বছরে ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক লোকসান বা ক্ষতির সম্মুখীন হলেও যদি রয়্যালটি, লাইসেন্স মাশুল বা কারিগরি সহায়তা বাবদ অর্থ পরিশোধ করে, তবে ওই অর্থের পুরোটা বা একটি অংশ কর কর্তৃপক্ষ খরচ হিসেবে অগ্রাহ্য করে। অগ্রাহ্যকৃত অর্থ কোম্পানির আয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেই পরিমাণ আয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট করহার অনুযায়ী কোম্পানিগুলোকে কর পরিশোধ করতে হয়। এর ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানিগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক আর্থিক প্রভাব পড়ে।
এই বিধানের ফলে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। কারণ, শুরুতে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে বাজার সম্প্রসারণ, ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে হয়। এই সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পরিচালিত হয়। কিন্তু নিট মুনাফা না থাকলে তারা কার্যত এই ব্যয়–সুবিধা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে না।
অন্যদিকে ব্যবসা লাভজনক হওয়ার পরও রয়্যালটি বা প্রযুক্তি মাশুল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা বহাল থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশের বাজার একটি সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ পরিবেশ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এর কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
নিঃসন্দেহে এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য কর ফাঁকি রোধ এবং অযৌক্তিকভাবে মুনাফা বিদেশে স্থানান্তর নিয়ন্ত্রণ করা। তবে বাস্তবতায় এটি আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ও বহুজাতিক বিনিয়োগের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত তাদের প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড ভ্যালু, পরিচালন দক্ষতা ও ব্যবসায়িক মডেল ব্যবহারের বিপরীতে নির্দিষ্ট রয়্যালটি ও লাইসেন্স মাশুল গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে এই ব্যয়ের সীমা কঠোরভাবে নির্ধারিত থাকায় অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাজারটিকে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করে।
ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব সুরক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি সম্প্রসারণের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে। তাই সময়ের দাবি হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী করনীতি প্রণয়ন, যেখানে কর ফাঁকি প্রতিরোধের পাশাপাশি বৈধ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের কর ব্যবস্থায় রয়্যালটি, লাইসেন্স মাশুল, কারিগরি সেবা মাশুল, কারিগরি কৌশল বা সহায়তা বাবদ মাশুল এবং স্পর্শাতীত সম্পদ ব্যবহারের বিপরীতে প্রদেয় অন্যান্য সমজাতীয় ব্যয়ের পরিশোধ সাধারণত ব্যবসায়িক ব্যয় হিসেবে করছাড়যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট উৎসে কর কর্তন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণের বিধান মেনে চলা আবশ্যক।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করা গেলে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এখনো সীমিত। অথচ সম্ভাবনা বিশাল। বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্র্যান্ডগুলো এ দেশে এলে শুধু খাদ্য বা খুচরা বাজারেই নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, পর্যটন ও বিনোদন খাতেও নতুন বিনিয়োগের জোয়ার তৈরি হতে পারে। এর ফলে নগর অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং শক্তিশালী হবে সেবাভিত্তিক অর্থনীতি।
একই সঙ্গে তৈরি হবে কর্মসংস্থানের বিস্তৃত সুযোগ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা এই সংকট অনেকটাই লাঘব করতে পারে। বিক্রয়কর্মী, ব্যবস্থাপক, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইটি বিশেষজ্ঞ, বিপণনকর্মী, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব শুধু শহরকেন্দ্রিক থাকবে না; স্থানীয় কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি খাত দেশের অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের আগমন মানে শুধু নতুন আউটলেট চালু হওয়া নয়; এর সঙ্গে আসে আধুনিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত গ্রাহকসেবার সংস্কৃতি। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও তখন আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের প্রস্তুত করতে বাধ্য হন। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ে, বাজারের মান উন্নত হয় এবং সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও আধুনিক ও দক্ষ হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে করনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশ সরকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বর্তমানে দেশে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম আরও সহায়ক করা এবং নতুন কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—
১. সবার আগে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল করনীতি। বিনিয়োগকারীরা জানতে চায়, আগামী ৫ বা ১০ বছরে করকাঠামো কেমন থাকবে। হঠাৎ কর বৃদ্ধি কিংবা নীতির পরিবর্তন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। তাই অন্তত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য করকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
২. আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজির রয়্যালটি, লাইসেন্স মাশুল ও প্রযুক্তি সহায়তা মাশুলের ওপর করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫৫(ই) সংশোধন করে ‘ব্যবসায়িক টার্নওভারের ৬ শতাংশ অথবা নিট মুনাফার ১৫ শতাংশের মধ্যে যেটি কম’—এ সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করতে হবে।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এ খাতে অতিরিক্ত উৎসে কর ও ব্যয় অগ্রাহ্য করার বিধান প্রয়োগ করা হয়, যা বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বাংলাদেশকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল বাজারে পরিণত করছে। বাস্তবতা হলো, একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তারা শুধু মুনাফা অর্জন করে না; বরং প্রযুক্তি, দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন ব্যবসায়িক সংস্কৃতিও নিয়ে আসে। তাই রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি ও কারিগরি সহায়তা বাবদ প্রদত্ত অর্থকে কেবল ব্যয় হিসেবে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৩. নতুন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কর অবকাশ সুবিধা চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি ও পর্যটন খাতে এ ধরনের প্রণোদনা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য লাভজনক হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশকে বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য অর্থনীতি’ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। বিনিয়োগকারীরা কম করের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে।
আজ বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে বিনিয়োগের গন্তব্য খুঁজছে। চীনের বাইরে বিকল্প বাজারের সন্ধানে বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশ যদি এখনই সাহসী ও আধুনিক কর সংস্কার করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি খাত শুধু নতুন বিনিয়োগই আনবে না; এটি কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও নগর অর্থনীতির বিকাশে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। অন্যথায় আমরা হয়তো আবারও সেই পুরোনো বাস্তবতায় আটকে থাকব, সম্ভাবনা থাকবে, কিন্তু নীতিগত জটিলতায় বিনিয়োগ চলে যাবে অন্য দেশে।