মো. আব্দুর রউফ, সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
মো. আব্দুর রউফ, সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

বিশ্লেষণ

ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা নিয়ে পিছুটান, কী শিক্ষা পেলাম

মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে সারা মাসের কার্যক্রমের হিসাব অর্থাৎ দাখিলপত্র বা রিটার্ন সাধারণত পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে দাখিল করতে হয়।

গত বাজেটের সময় অর্থ আইনের মাধ্যমে মাসিক রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তন করে ত্রৈমাসিক দাখিলের নিয়ম করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিল করা ব্যবসা সহজীকরণ বলে মনে হলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব সুরক্ষা ও হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক নীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে সিদ্ধান্তটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। মাঠপর্যায়ে ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেকেই সে সময়ে বলেছিলেন যে সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। ভ্যাট রিটার্ন প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর দাখিল করার অনেক প্রভাব রয়েছে।

সরকারের অর্থ তিন মাস ব্যবসায়ীর কাছে থাকলে প্রয়োজনে চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে ফেলতে পারেন তাঁরা। তিন মাস পর রিটার্ন দাখিল করার সময় বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধের সামর্থ্য না থাকলে তিনি ফাঁকি দেওয়ার পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে পারেন। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ে লোকসান হলে সংগৃহীত ভ্যাটের অর্থ নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারে বাধ্য হতে পারেন।

স্বচ্ছভাবে হিসাব সংরক্ষণ করে—এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। তিন মাস পর রেয়াত নিতে গেলে অনেক ক্রয় দলিলের বিপরীতে হিসাব মেলানো জটিল। সাপ্লাই চেইনের একটা প্রতিষ্ঠান তিন মাস পর রিটার্ন দাখিল করলে রেয়াত দাবির সময়সীমা ও ইনভয়েস ট্র্যাকিং দুরূহ হবে। তিন মাসের ক্রয় হিসাব, বিক্রয় হিসাব ও চালানপত্র একসঙ্গে জমা হলে হিসাব বিভাগের ওপর সাময়িকভাবে কাজের চাপ বেড়ে যাবে। আবার রিটার্ন দাখিলের পর দীর্ঘদিন কাজের চাপ থাকবে না। এতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও বিরূপ প্রভাব পড়বে।

দাখিল করা রিটার্নে কোনো ভুল হলে পরবর্তী মাসেই তা সংশোধন করা সহজ। ত্রৈমাসিক পদ্ধতিতে ভুলের প্রভাব তিন মাসের লেনদেনের ওপর পড়বে, যা উদ্‌ঘাটন ও সংশোধন করা জটিল। সরকারের প্রতি মাসে কিছু নির্দিষ্ট পরিচালনা ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় থাকে। ভ্যাট প্রতি মাসে সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে তিন মাস পর জমা হলে সরকারের তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে।

ভ্যাট কর্মকর্তারা প্রতি মাসে দাখিলপত্র যাচাই–বাছাই করে ভ্যাট ফাঁকি রোধে কাজ করেন। তিন মাসের তথ্য ও দলিলপত্র একসঙ্গে জমা হলে সীমিত জনবল দিয়ে এত বেশি লেনদেন যাচাই করা দুরূহ হয়ে পড়বে। এভাবে ভ্যাট বকেয়া হয়ে গেলে তা আদায়ের জন্য ঘন ঘন কারণ দর্শানো নোটিশ, ডিমান্ড নোটিশ ইত্যাদি জারি করতে প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলা জট বেড়ে যেতে পারে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি সঠিক নয়। কোনো অংশীজন এটা দাবি করেননি। তাহলে কেন করা হলো, কীভাবে করা হলো, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কত বিষয় রয়েছে যা অংশীজনেরা দাবি করেন, তারপরও সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। অথচ এই বিষয় কেউ না চাইতেই বাস্তবায়িত হয়ে গেল। বোঝা যায় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার অভাব ছিল। এই ঘটনা থেকে আমরা আরও বুঝতে পারি যে, এভাবে এক পা এগিয়ে আবার এক পা পেছানো হলে নিজ স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকা হয়—অগ্রসর হওয়া যায় না।

জনগণের দেওয়া কর যা সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য ব্যবসায়ীর কাছে রয়েছে, তা দীর্ঘদিন ব্যবসায়ীর কাছে রেখে দেওয়া সমীচীন নয়। জনগণের করের অর্থ রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে ব্যয় হবে। ভোক্তা ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে কর বাবদ অর্থ দিয়ে দেন, অথচ সরকার সেই অর্থ নিজের কোষাগারে না এনে তিন মাস ব্যবসায়ীর কাছে বিনা সুদে রেখে দেবে। আবার সরকার তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে—এটা একধরনের বৈপরীত্য। তিন মাস ধরে শত শত কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের হাতে থাকলে সরকার অর্থের সময়মূল্য থেকেও বঞ্চিত হবে।

ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা গত জুনে এক মাস থেকে তিন মাস করার পর জুলাই–আগস্ট মাসের রাজস্ব আহরণ বেশ কমে যায়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য মতামত দেওয়া শুরু করেন। অবশেষে ১৪ অক্টোবর অধ্যাদেশ জারি করে আবার রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা এক মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই ঘটনা থেকে প্রথমত আমরা বুঝতে পারি যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি সঠিক নয়। কোনো অংশীজন এটা দাবি করেননি। তাহলে কেন করা হলো, কীভাবে করা হলো, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কত বিষয় রয়েছে যা অংশীজনেরা দাবি করেন, তারপরও সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। অথচ এই বিষয় কেউ না চাইতেই বাস্তবায়িত হয়ে গেল। বোঝা যায় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার অভাব ছিল। এই ঘটনা থেকে আমরা আরও বুঝতে পারি যে, এভাবে এক পা এগিয়ে আবার এক পা পেছানো হলে নিজ স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকা হয়—অগ্রসর হওয়া যায় না। আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বারবার এমন হচ্ছে। তাই অগ্রগতি হচ্ছে না।

শুনছি, নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট আদায় করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ১২ লাখ ছোট প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত করে এক হাজার টাকা করে ভ্যাট আদায় করার কথা বলা হচ্ছে। এতে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভ্যাট আদায় হবে না। তারপরও এই কাজ করা হচ্ছে। ১৯৯৮ সালে এই পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছিল। এবারও নিশ্চিত ব্যর্থ হবে। হুট করে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ানো এবং ফিরে আসা থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হলো না।

দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব খাতের বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলে আসছেন যে রাজস্ব ফাঁকি হয় মূলত এবং প্রধানত ক্রয়–বিক্রয়ের তথ্য গোপন করে। তাই রাজস্ব সংস্কারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ক্রয়–বিক্রয়ের সব তথ্য এনবিআরের কাছে নিয়ে আসা। তাহলে প্রকৃত বিক্রির ওপর ভ্যাট ও আয়কর সঠিক পরিমাণে আদায় করা সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জোরালো পদক্ষেপ দরকার।

ইতিমধ্যে আবার আইএমএফের পদচারণ শুরু হয়েছে। তাদের তোতা পাখির বুলি—আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, করের ভিত্তি সম্প্রসারণ, অব্যাহতি কমানো, ইউনিফর্ম করহার চালু, টিআইএন–বিআইএন একীভূত করা, নীতি এবং বাস্তবায়ন আলাদা করা—আবার এসব বিষয় সামনে চলে আসবে। সবশেষে ব্যর্থ হবে। আবার নতুন করে শুরু হবে। এভাবে চলতে থাকলে রাজস্ব সংস্কার হবে না।

মো. আব্দুর রউফ, সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড