
পৃথিবীতে অস্থিরতা বাড়ছেই। বাংলাদেশও এ থেকে মুক্ত নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়েছে। সত্যিকার অর্থে এ সমস্যায় ভুগছে পুরো বিশ্ব। করোনার ধাক্কার পর এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তারা কেন যুদ্ধ করছে সাধারণ জনগণ জানে না। কিন্তু যুদ্ধের খেসারত শুধু ওই দুই দেশকে নয়, সারা বিশ্বকে দিতে হচ্ছে। গরিব ও নির্ভরশীল দেশগুলোকে বেশি ভুগতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? মূলত সমস্যার কারণ একটি নয় এবং নির্দিষ্ট একটি উপায়ে সমাধানও হবে না। কিন্তু একটি বিষয়ের অনুপস্থিতি আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। সেটা হচ্ছে মানুষে মানুষে ভালোবাসার অভাব। সত্যিকার ভালোবাসার অভাব। তাই অস্থিরতা মোকাবিলায় আমি বলি, ১০০ ভাগ হালাল ভালোবাসা প্রয়োজন।
হালাল শব্দটি ইসলামি পরিভাষা। এটি এখন শুধু খাবারে নয়, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। যেমন হালাল পর্যটন, হালাল পোশাক, হালাল এভিয়েশন ইত্যাদি। হালাল বলতে বোঝায় যেটা মুসলিমদের জন্য বৈধ। অর্থাৎ ইসলামি বিধানে মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য।
নানাভাবে মুসলিমরা এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। দুটি প্রধান কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। একটি হচ্ছে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে অভিবাসী হওয়ার কারণে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তুলনামূলক উচ্চ জন্মহারের কারণে। ফলে ইসলামি সংস্কৃতি অমুসলিম দেশেও স্থান করে নিয়েছে। এটাকে সম্মান করে ব্যবসায়ীরা মুসলিমদের জন্য খাবারসহ অন্যান্য পণ্য হালাল উপায়ে বিক্রি করছেন। তাই পাশ্চাত্য বিশ্বে হোটেলগুলোতে হালাল কর্নার পাওয়া যায়। খাবারের প্যাকেটে লেখা থাকে হালাল অথবা নন-হালাল।
এ ছাড়া মুসলিম বিশ্বেও হালাল শব্দটির গুরুত্ব অনেক বেশি। মুসলিম দেশে পণ্য রপ্তানি করতে হলে হালাল সার্টিফিকেট নিতে হয় এবং পণ্যের গায়ে সেটা লেখা থাকতে হয়। বাংলাদেশে বিএসটিআই-ও এই সার্টিফিকেট দিচ্ছে। ফলে মুসলিম–অমুসলিম সব উদ্যোক্তা এটা অনুসরণ করছেন। এগুলো কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। মূলত প্রত্যেক মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে হালাল শব্দটি মিশে আছে। লাইফস্টাইলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। হালাল শব্দটা মুসলিমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। হালাল ইস্যুর সঙ্গে তাঁদের আবেগ জড়িত।
আমি যখন নব্বইয়ের দশকে অ্যারোমেটিক বিউটি সোপকে ‘১০০ ভাগ হালাল সাবান’ স্লোগান দিলাম, তখন দেখা গেল সাবান প্রচুর বিক্রি হলো। এই স্লোগান আমি দিতে পেরেছিলাম কারণ উদ্ভিদ তেল থেকে এই সাবান তৈরি করা হয়েছিল। এখানে প্রাণিজ চর্বি ব্যবহার করা হয়নি। মুসলিমদের জন্য শূকরের চর্বি এবং হিন্দুদের জন্য গরুর চর্বি যার যার কাছে হারাম। তাই স্লোগানটি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
আমি যখন নব্বইয়ের দশকে অ্যারোমেটিক বিউটি সোপকে ‘১০০ ভাগ হালাল সাবান’ স্লোগান দিলাম, তখন দেখা গেল সাবান প্রচুর বিক্রি হলো।সৈয়দ আলমগীর
হালাল শব্দটি এখন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অনেক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে। কারণ, এটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আবেগ ও বিবেককে নাড়া দেয়। এমনকি এই কারণেই দেশে দেশে এখন ইসলামী ব্যাংক, বিমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান জনপ্রিয় হচ্ছে। মানুষের অনেক সমস্যার সত্যিকার সমাধান হালাল অনুসরণ করার মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।
বস্তুত উদারতা, দয়া, মায়া, মহব্বত ইত্যাদি সবই হালাল ভালোবাসার অংশ। অথচ বর্তমান দুনিয়ায় এগুলোকে বড় করে দেখা হয় না। বরং উপেক্ষা করা হয়। তাই বর্তমান অস্থির বিশ্বে ১০০ ভাগ হালাল ভালোবাসা আমি খুবই অনুভব করি। এর মধ্যে আমি সমাধান খুঁজে পাই। হালাল শব্দটি যদি ব্যবসা–বাণিজ্যে সমৃদ্ধি আনে, তাহলে পরিবার ও সমাজেও শান্তি আনবে।
এদিকে মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশকে আমরা কি যথাযথ ভালোবাসছি? আমার মনে হয় এখানে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। মাতৃভূমি বাংলাদেশকে এখনো কাঙ্ক্ষিত মানের ভালোবাসতে পারিনি। যারা ঘুষ, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তারা তো অন্যায় করছেই, আমরা যারা ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা হিসেবে পরিচিত, তারা কতটুকু করছি?
এই প্রশ্ন এ জন্য করছি কারণ আমাদের মধ্যে ইতিবাচক কিছু গড়ে তোলার মানসিকতা কম। বরং অভিযোগপ্রবণতা বেশি। নিজে থেকে দায়িত্ব নিতে চাই না। নালিশ করে পার পাওয়ার চেষ্টা করি। হয়তো আমি দোষী না, কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রত্যেক সংকট উত্তরণে আমার কিছু করণীয় আছে। এভাবে কেন ভাবি না?
যেমন ধরুন, যানজট নিয়ন্ত্রণে কিছু ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। মোটাদাগে সেই সব কর্মকর্তার দায়িত্বের অবহেলা থাকলে দোষটা তাদেরই। তবে আমিও কিন্তু এই দেশের নাগরিক। এই শহরের রাস্তায় চলাফেরা করি। রাস্তা পারাপারে আমারও কিছু ভূমিকা আছে। রাস্তা ময়লা না করা আমারও দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা ছোট ছোট ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা কি ভালোবাসার ঘাটতি না? ‘১০০ ভাগ হালাল ভালোবাসা’ বলতে আমি এ জায়গাতেও উন্নতি চাই।
এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা ও নিয়োগে কিছু দুর্বলতার কথা মাঝেমধ্যে শুনতে পাই। সংশ্লিষ্ট যাদের এসবে গাফিলতি আছে, তারা অবশ্যই দোষী। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যদি এসব দুর্বলতার সুযোগ নেয়, সেটা খুবই দুঃখজনক। কারণ, এতে নিজের প্রতি ভালোবাসাটুকুও থাকে না। নকল করে সাময়িক সময়ের জন্য ভালো ফল করতে পারলেও কর্মক্ষেত্রে ঠিকই তার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। আর এর ফলে দেশ ও রাষ্ট্র মেধাবীদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারে না। তাই ছোট–বড় এই সব ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রসঙ্গেও আমাদের হালাল ভালোবাসার নিদর্শন রাখতে হবে। নিজের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য নৈতিকতাকে ভালোবাসতে হবে।
আদিকাল থেকেই পৃথিবীর কোনো একটি অঞ্চল স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। বরং আদি যুগের মানুষেরা এ জন্য ছিল যাযাবর। পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থাতেও একই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। দেশগুলোকে আমদানি–রপ্তানির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই প্রতিবেশীসহ দূরদেশের সবার সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ ভালোবাসার সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি নাগরিক প্রবাসী হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে বাস করছেন। প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভর করে দেশে থাকা তাদের স্বজন ও আত্মীয়রা।
তাই বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক যার যার অবস্থান থেকে সম্মিলিত ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের ভূমিকা হবে মানবতার জন্য। দেশের আপামর জনগণের কল্যাণের জন্য। আমরা যেন একটি পরিবার হয়ে দেশে বিদেশে চলতে পারি। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, বিশ্বাসের বৈচিত্র্য থাকবে কিন্তু নৈতিকতা ও হালাল ভালোবাসার প্রশ্নে কোনো আপস থাকবে না। তাই আগামীর বিশ্ব হোক হালাল ভালোবাসার পৃথিবী।
লেখক: এমডি ও সিইও—আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপ