
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিং – ২০২৪ এর তালিকায় রয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি। তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি টেকসই অর্থায়নের আওতাভুক্ত। টেকসই অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল কাশেম মো. শিরিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই ব্যাংকের তালিকায় আপনার ব্যাংকও রয়েছে। টেকসই অর্থায়নকে আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?
আবুল কাশেম মো. শিরিন: ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শুরু থেকেই টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে, যা আমাদের ভিশন স্টেটমেন্ট বা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা কোনো প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সেই প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব ও নেতিবাচক প্রভাবগুলো হ্রাস করার বিষয়ে উদ্যোক্তারা কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেটা বিবেচনায় নিয়ে থাকি। এ ছাড়া প্রকল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক কাঠামো, বাজারভিত্তিক তথ্য ও আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করে অর্থায়নের সিদ্বান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে আমাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি টেকসই অর্থায়নের আওতাভুক্ত। এসব ঋণ কৃষি, পরিবেশবান্ধব কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধশিল্প, সিরামিক ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে দেওয়া ঋণ আদায় নিয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?
আবুল কাশেম মো. শিরিন: টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করা ঋণ আদায়, বিশেষত পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের ঋণ আদায় অত্যন্ত সন্তোষজনক। তা ছাড়া আমরা প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত দিকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রভাব, আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকি। সে কারণে আমাদের ঋণ আদায় সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকে।
”আমাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি টেকসই অর্থায়নের আওতাভুক্ত।আবুল কাশেম মো. শিরিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাচ্বাংলা ব্যাংক
ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের সেবার পরিধি দেশজুড়ে কতটুকু ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন? মানুষ কি সহজেই আপনাদের সেবা নিতে পারছে?
আবুল কাশেম মো. শিরিন: বর্তমানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২৪৩টি শাখা, ৩০৭টি উপশাখা, ৫ হাজার ৬২০টি এজেন্ট আউটলেট এবং ৮ হাজার ৫৮৬টি এটিএম ও সিআরএমের মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলে সব শ্রেণি–পেশার মানুষকে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। দেশের সব উপজেলাসহ গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপশাখা, ফাস্ট ট্র্যাক অথবা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের মোবাইল আর্থিক সেবা রকেট দেশজুড়ে বিস্তৃত। এই পুরো নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগণকে জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরক্ষর লোকও সার্বক্ষণিক আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সুবিধা নিতে পারছেন। বর্তমানে ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা ৫ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৭৪ লাখ। এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে। তাদের ৪১ শতাংশ নারী। এভাবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক জনগণের আস্থা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।
আপনাদের সিএসআর উদ্যোগগুলো সমাজে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
আবুল কাশেম মো. শিরিন: সিএসআর কার্যক্রমে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক মনে করে শিক্ষাই জনগণের মধ্যে সচেতনতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখে। তাই সিএসআর কার্যক্রমে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সে জন্য সিএসআর খাতে আমাদের প্রধান প্রকল্প শিক্ষাবৃত্তি প্রকল্প। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি ও নারী শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্দেশ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এই বৃত্তির ৯০ শতাংশ দেওয়া হয় গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের, যাঁদের মধ্যে ৫০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানদের মাসিক ও বাৎসরিক ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৭০ হাজার ছাত্র–ছাত্রীকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় গণিত অলিম্পিয়াড, ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড নিয়মিত আয়োজন করে আসছে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সিএসআর কার্যক্রমে স্বাস্থ্য খাতকেও গুরুত্ব দিয়ে আসছে। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘দৃষ্টি প্রোগ্রাম’, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের বিনা মূল্যে চোখের ছানি অপারেশন করা হয়। দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষের অসহায়ত্বের কথা মাথায় রেখে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক চোখের ছানি অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের চোখের ছানি অপারেশন করা হয়েছে। সেবাভুক্ত লোকজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা জয় করে পারিবারিক ও কর্মজীবনে ফিরেছেন।