
ঈদ সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকার তৈরি পোশাকের পাইকারি মার্কেটগুলোতে এখন জমজমাট বেচাকেনা চলছে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত অবধি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মার্কেটসহ আশপাশের পাইকারি মার্কেটগুলো থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারেরা বাহারি সব পোশাক নিয়ে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে ক্রেতা–বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের ঈদে সবচেয়ে বেশি চাহিদা আফগান ও ফারসি থ্রি-পিসের। সেই সঙ্গে ওয়াশ, জর্জেট, পপকর্ন, লুচি, গাড়ারা ও সারারা পোশাকের কাটতি ভালো। এ ছাড়া চীনের সিমুজি, সুতি ও টিস্যু নেট কাপড় দিয়ে তৈরি থ্রি-পিস, টু-পিস ও লেহেঙ্গার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন পর্যন্ত বেচাকেনা ভালো হয়েছে, যা ২৭ রোজা পর্যন্ত চলবে। সব মিলিয়ে তাঁরা এবারের ঈদে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার পোশাক বিক্রির আশা করছেন।
বিক্রেতারা জানান, ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা এখান থেকে পোশাক কিনে নিয়ে যান। সাশ্রয়ী দাম ও বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের কারণে দেওভোগ এখন দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে আকর্ষণীয় পাইকারি বাজার হয়ে উঠেছে।
মীর ফ্যাশনের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. সোহাগ প্রথম আলোকে বলেন, এবারের ঈদে বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। আফগান ও ফারসি থ্রি-পিস, জর্জেট, পপকর্ন ও লুচি কাপড়ের পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। শিশুদের পোশাক প্রতি ডজন ৩ হাজার ৬০০ টাকা। আর ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের থ্রি-পিস প্রতি ডজন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
* প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতাদের ভিড়।* এবার ২৫০–৩০০ কোটি টাকার পোশাক বিক্রির আশা ব্যবসায়ীদের।* আফগান ও ফারসি থ্রি-পিসসহ নতুন ডিজাইনের পোশাকের চাহিদা বেশি।
শান্তা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক নাজিম উদ্দিন জানান, তাঁদের দোকানে আফগান-ফারিস থ্রি-পিস এবং সুতি ফ্রকের চাহিদা বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারেরা সশরীর যেমন আসছেন তেমনি অনেকেই আবার অনলাইনেও অর্ডার দিচ্ছেন। শেষের দিনগুলোতে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে আসা কাপড় ব্যবসায়ী কাবলু মিয়া জানান, চায়না কাপড়ের ডিজাইনের পোশাকের চাহিদা বেশি। কাপড়ের মান ও ডিজাইনের কারণে এ ধরনের পোশাক ক্রেতাদের বেশি পছন্দ। তবে গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি পিস পোশাকের দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এ নিয়ে কারখানামালিকেরা বলছেন, পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত আমদানি করা কাপড়, শাটন, আস্তর, বোতাম, ওড়না, সুতা, ঝুমকা ও রাবারসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে পোশাকের দাম কিছুটা বেড়েছে।
কুমিল্লার হোমনা থেকে আসা পাইকার জসিম উদ্দিন জানান, এবারের ঈদে তিনি দুই দফায় এখান থেকে পোশাক কিনে নিয়ে গেছেন। আশা করছেন, চাঁদরাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলবে।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকিন প্রথম আলোকে বলেন, বেচাকেনা এখন পর্যন্ত ভালোই হয়েছে। চাকরিজীবীরা ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেলে বিক্রি আরও বাড়বে।
গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা ভালো বেচাকেনা করতে পারেননি। এবার পরিস্থিতি ভালো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারেরা আসছেন। বেচাকেনা বেড়েছে। ২৭ রোজা পর্যন্ত বেচাকেনা চলবে।সুজন মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক, দেওভোগ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাধীনতার আগে থেকেই দেওভোগে তৈরি পোশাকের বড় পাইকারি বাজার গড়ে ওঠে। বর্তমানে এখানে প্রায় দেড় হাজার কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় মূলত শূন্য থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণীদের পোশাক তৈরি ও পাইকারি বিক্রি করা হয়। পোশাক বিক্রির জন্য রয়েছে পাঁচ শতাধিক শোরুম। বর্তমানে মালিক, শ্রমিক ও কর্মচারী মিলিয়ে এই ব্যবসায়ে লক্ষাধিক মানুষ জড়িত রয়েছেন।
ঈদ সামনে রেখে কারখানাগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। অধিকাংশ কারখানাতেই শ্রমিকেরা রাতভর পোশাক তৈরির কাজ করছেন বলে জানান মালিকেরা।
আরশ গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক রুবেল বলেন, ‘কারখানায় এখন প্রচুর কাজ। কারও দম ফেলার সময় নেই। সুতি কাপড়ের ফ্রক তৈরিতে দিন-রাত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ঈদের বেতন-বোনাস পাওয়ার পর আমরা কেনাকাটা করব।’
দেওভোগ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুজন মাহমুদ প্রথম আলোকে জানান, গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা ভালো বেচাকেনা করতে পারেননি। এবার পরিস্থিতি ভালো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারেরা আসছেন। বেচাকেনা বেড়েছে। ২৭ রোজা পর্যন্ত বেচাকেনা চলবে।
সুজন মাহমুদ জানান, এবারের ঈদে সহস্রাধিক দোকানে সব মিলিয়ে ২৫০ থেকে থেকে ৩০০ কোটি টাকার পোশাক বেচাকেনা হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।