বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৭ শতাংশে

দেশের আর্থিক খাতের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকায়। খেলাপির এই হার খাতটির বিতরণ করা ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এই হিসাব গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস শেষের। তখন খাতটির ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণ ছিল ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা ছিল খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। ফলে ৩ মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা।

আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি পি কে হালদার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যে অনিয়ম করে গেছেন, এখনো তার জের টানতে হচ্ছে পুরো খাতকে। পি কে হালদারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় ছিল এমন কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই খারাপ। পি কে হালদার যখন এসব অনিয়ম করেন, তখন তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন আভিভা ফিন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। দুটি প্রতিষ্ঠানই এখন বন্ধের তালিকায় রয়েছে।

এদিকে সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলেও ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নপ্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং। এর মধ্যে প্রথম চারটি আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের কারণে রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে আর আভিভা ফিন্যান্স ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সাইফুল আলম বা এস আলমের প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অবসায়নপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে পরিচালককে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও দুজন করে কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি অকার্যকর ঘোষণা করা হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠান এখন গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠান ধুঁকছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ৯ প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি আমানত আটকে পড়েছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই হিসাবে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করার আইনি প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা রোজার আগেই ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে ব্যক্তি আমানতকারীরা তাঁদের আমানতের পুরো অর্থ ফেরত পাবেন।