বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক

বন্ধ হচ্ছে ৯ এনবিএফআই

দুই দফায় টাকা পাবেন ব্যক্তি আমানতকারীরা

অবসায়ন বা বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়া ব্যাংকবহির্ভূত ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নপ্রক্রিয়া শুরু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অবসায়নপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে পরিচালককে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও দুজন করে কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি অকার্যকর ঘোষণা করা হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং। এর মধ্যে প্রথম চারটি আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের কারণে রুগ্‌ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আর আভিভা ফাইন্যান্স ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সাইফুল আলম বা এস আলমেরও প্রতিষ্ঠান। পি কে হালদারও ছিলেন এস আলমের ঘনিষ্ঠ।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠান এখন গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠান ধুঁকছে।

গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা রোজার আগেই ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে ব্যক্তি আমানতকারীরা তাঁদের আমানতের পুরো অর্থ ফেরত পাবেন।

টাকা দেওয়া হবে দুই দফায়

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শিগগির অকার্যকর ঘোষণা করে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৯০ শতাংশের ওপরে। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের আগে প্রশাসক বসিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার টাকা ছাড় করলে ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার দুই দফায় টাকা ছাড় করবে বলে জানা গেছে। তাই আমানতকারীদেরও দুই দফায় টাকা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হলেও টাকা পাওয়া নিয়ে আমানতকারীদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

* প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বিআইএফসি, এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং।* এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের।* গত বছরের জুন শেষে এনবিএফআই খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা এই খাতের বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ৯টি প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি আমানত আটকা পড়েছে পিপলস লিজিংয়ে। যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই হিসাবে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের কী হবে

ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পর ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করতে অবসায়ক নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসকেরাই অবসায়কের দায়িত্ব পালন করবেন। অবসায়কেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেবেন। সম্পদ বিক্রির টাকা থেকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। এরপর আদালতের মাধ্যমে অবসায়ন করা হবে প্রতিষ্ঠান নয়টি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে ২০টি এনবিএফআই বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ১১টি এনবিএফআই ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। তাতে সন্তুষ্ট হয়ে সেগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময় বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত বছরের জুন শেষে ৩৫টি এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি পি কে হালদার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যে অনিয়ম করে গেছেন, তার জের টানতে হচ্ছে পুরো খাতকে। পি কে হালদারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় ছিল এমন কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই খারাপ। পি কে হালদার যখন এসব অনিয়ম করেন, তখন তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বিবেচিত এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন আভিভা ফাইন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। দুটি প্রতিষ্ঠানই এখন বন্ধের তালিকায় রয়েছে।