ব্যাংকের অ্যাপস ও ইন্টারনেটভিত্তিক সেবায় ঝুঁকছেন গ্রাহকেরা

বিশ্বজুড়ে এখন ডিজিটাল তথা ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন।

সেলিম আর এফ হোসেন
সেলিম আর এফ হোসেন
প্রশ্ন

প্রথম আলো: ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে অনেক সেবা এখন ডিজিটাল হয়ে গেছে। ব্যাংকিং সেবা, বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন কতটা ডিজিটাল হয়েছে। এসব সেবার ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

সেলিম আর এফ হোসেন: ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংকিং সেবা ডিজিটাল হয়ে উঠেছে। এখন এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে কিংবা এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে টাকা পাঠানো, পরিষেবা বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা এখন অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এসবের সঙ্গে ই-কেওয়াইসি সেবার মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংক সম্পূর্ণ ডিজিটালি গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব খোলার সেবাও দিচ্ছে। বেশির ভাগ ব্যাংকিং সেবাই বর্তমানে ডিজিটালি সম্পন্ন করা যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তীকালে বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছে। যার ফলে গত এক বছরে ডেবিট কার্ডে লেনদেন ৪৪ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। সময়, স্বাচ্ছন্দ্য ও দ্রুততা বিবেচনায় গ্রাহক এখন অ্যাপস ও ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন।

প্রশ্ন

প্রথম আলো: দেশে ডেবিট কার্ড প্রায় ৩ কোটি, কিন্তু ক্রেডিট কার্ড মাত্র ২১ লাখ। ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক কেন বাড়ছে না? কোন কার্ডের ভবিষ্যৎ ভালো দেখছেন?

সেলিম আর এফ হোসেন: ক্রেডিট কার্ড একটি ঋণভিত্তিক সেবা, যেখানে লেনদেনের ওপর সুদ নির্ধারিত হয়। আগে ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক ঋণসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের মধ্যে একটি ভীতি কাজ করত, যা করোনাকালে ও করোনা-পরবর্তী সময়ে অনেকাংশে কমে এসেছে। এখন গ্রাহকেরা ক্রেডিট কার্ড সেবা গ্রহণ ও সুদমুক্ত সময়ের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে করা লেনদেনের বিল পরিশোধের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। তদুপরি, বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যম, যেমন ব্যাংক অ্যাপস, এমএফএস (মোবাইলে আর্থিক সেবা) ইত্যাদি কার্যকর ভূমিকা পালন করায় ক্রেডিট কার্ডের ওপর গ্রাহকের আস্থা ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকসংখ্যা আরও বাড়বে।

অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিটি ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে ডেবিট কার্ড দিয়ে থাকে। বর্তমানে কিছু কিছু ব্যাংক দ্বৈত মুদ্রার ডেবিট কার্ড দিচ্ছে, যা দিয়ে গ্রাহকেরা দেশি-বিদেশি সব ধরনের লেনদেন করতে পারছেন। এসব বিচারে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের ভবিষ্যৎ সামগ্রিকভাবেই দিন দিন উজ্জ্বল হচ্ছে।

প্রশ্ন

প্রথম আলো: ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকেরা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করছেন তো? কোন শ্রেণি-পেশার গ্রাহক ক্রেডিট কার্ড বেশি ব্যবহার করছেন?

সেলিম আর এফ হোসেন: প্রথমত, করোনাকালে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি পরিলক্ষিত হলেও বর্তমানে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা সচেতন। নগদে পরিশোধের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল উপায়ে বিল পরিশোধ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার ফলে গ্রাহকেরা সময়মতো ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছেন। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এখন কার্ডভিত্তিক লেনদেনে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে তরুণ পেশাজীবী, মধ্যম ও উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি দেখা হচ্ছে।

প্রশ্ন

প্রথম আলো: রাজধানী ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সীমাবদ্ধ। পুরো দেশে ক্রেডিট কার্ড ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না কেন?

সেলিম আর এফ হোসেন: আগের ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমগুলো, যেমন পিওএস মেশিন, এটিএম বুথ ইত্যাদি সুবিধাগুলো বিভাগীয় শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন এবং মোবাইলে আর্থিক সেবা বা এমএফএসের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভাগীয় শহরের বাইরেও ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রশ্ন

প্রথম আলো: প্লাস্টিক কার্ড নাকি অ্যাপস? কোন পথে বেশি এগোচ্ছে বাংলাদেশ?

সেলিম আর এফ হোসেন: প্লাস্টিক কার্ড ও ব্যাংকিং অ্যাপ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর, ফান্ড ট্রান্সফার, ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট ও এমএফএসে লেনদেন হচ্ছে। আবার বিভিন্ন ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমেও স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। এই অগ্রযাত্রার অংশ হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রাহকেরা তিন লাখের বেশি বিকাশ মার্চেন্ট পয়েন্টেও ‘আস্থা’ অ্যাপ দিয়ে কিউআর কোডভিত্তিক ট্রানজেকশনের সুবিধা পাচ্ছেন।

প্রশ্ন

প্রথম আলো: ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকের কতটা নিরাপত্তা রয়েছে? এ ক্ষেত্রে কী কী ঝুঁকি থাকতে পারে? গ্রাহকেরই–বা কী ধরনের সচেতনতা প্রয়োজন এবং কতটা প্রয়োজন?

সেলিম আর এফ হোসেন: গ্রাহক সতর্ক থাকলে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ জন্য গ্রাহককে সব সময়ই নিজের কার্ডের বিভিন্ন তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। কার্ড নম্বর, পিন, সিভিভি কিংবা ওটিপি অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করার মাধ্যমে গ্রাহক ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে নিজেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। আমরাও প্রতিনিয়ত ই-মেইল, এসএমএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছি।

প্রশ্ন

প্রথম আলো: বিভিন্ন উৎসবে গ্রাহকদের নানা অফার দিচ্ছেন। এতে ব্যবসা কতটা বাড়ছে?

সেলিম আর এফ হোসেন: বিভিন্ন উৎসবে ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন এবারের রমজানেও ব্র্যাক ব্যাংক এক হাজারের বেশি পার্টনার আউটলেটে কার্ডে লেনদেনের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। অনলাইন ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনে রয়েছে ১৫ শতাংশ ক্যাশব্যাক। সেই সঙ্গে পাঁচ তারকা হোটেলগুলোয় একটি কিনলে ১/২/৩টি ফ্রি অফার তো আছেই। সব মিলিয়ে এই অফারগুলো ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের উৎসাহিত করছে।