
১৯৮৩ সালে ১২ জন উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা দ্য সিটি ব্যাংক এখন দেশের শীর্ষ ব্যাংকের একটি। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হোসেন খালেদ। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আনোয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সিটি ব্যাংকের কার্যক্রম, পরিকল্পনা ও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানাউল্লাহ সাকিব।
১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে সিটি ব্যাংক ‘প্রবলেম ব্যাংক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এরপর ঘুরে দাঁড়াল কীভাবে? এখন তো ব্যাংকটি দেশের শীর্ষ ব্যাংকের একটি।
হোসেন খালেদ: একসময় সিটি ব্যাংককে ‘প্রবলেম ব্যাংক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০০৬-০৭ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। ব্যাংকটি তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প নিয়েছিলাম। ২০০৭ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে, চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সারের তত্ত্বাবধানে আমরা পূর্ণাঙ্গ সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু করি। তরুণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাংকার নিয়োগ, শাখাভিত্তিক ঋণ প্রদান বন্ধ করে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত কার্যক্রম চালু, নতুন লোগো ও ব্র্যান্ডিং, সেবার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের সেরা চর্চা অনুসরণ—এসবের মাধ্যমে আমরা নতুন করে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করি। এই সময়ে অ্যামেক্সের একচেটিয়া লাইসেন্স গ্রহণ করে কার্ড ব্যবসায় অগ্রগতি আনি। পরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংস্থা আইএফসি ব্যাংকটির মালিকানায় যুক্ত হয়। পাশাপাশি নানা ধরনের নিত্যনতুন সেবা চালু করা হয়। তাতে ফলাফলও এসেছে দ্রুত। ২০০৭ সালে যেখানে আমানত ছিল মাত্র ৪ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, তা এখন বেড়ে হয়েছে ১৩ গুণ। ঋণ বেড়েছে ১৭ গুণ। ২০০৮ থেকে ২০১৬ ছিল আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। এরপরের বছরগুলো ছিল নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার সময়। সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়িক মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে সিটি ব্যাংক এখন দেশের শীর্ষ পাঁচ মুনাফাকারী ব্যাংকের একটি।
সিটি ব্যাংকের সাফল্যের পেছনে কোন ধরনের ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে? কার্ড ব্যবসা, রিটেইল ব্যবসা নাকি এসএমই ব্যবসা—কোন খাতে আপনাদের নজর বেশি ছিল?
হোসেন খালেদ: কার্ড ব্যবসায় আমেরিকান এক্সপ্রেস ছিল আমাদের আস্থার প্রতীক। তবে রিটেইল ব্যাংকিংয়ে আমাদের শক্তি কার্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত এক দশকে দ্রুত বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্যাংক থেকে শুধু সঞ্চয় বা ঋণ চায় না; তারা চায় গতি, সহজীকরণ ও প্রযুক্তি। সিটি ব্যাংক সেই পরিবর্তিত প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে। বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং এখন জনসাধারণের আর্থিক জীবন ও জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতির অন্যতম চালিকা শক্তি। এ বাজারে সিটি ব্যাংক কার্ড, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রোডাক্টের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
এ ছাড়া এসএমই খাতেও সিটি ব্যাংক শুরু থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আমাদের এসএমই ঋণ সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা এবং গ্রাহকসংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। যাঁদের বড় অংশই নারী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা। কৃষি খাতেও আমরা ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য ছাড়িয়ে সাফল্য অর্জন করছি। সিএমএসএমই খাতে এখন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, তা ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। এটা পাঁচ বছরে হয়তো হবে না। কিন্তু আমাদের সেই যাত্রাটা শুরু করে দিতে হবে। সরকারকে সে ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে, নীতিসহায়তা দিতে হবে।
আপনারা পারিবারিকভাবে বড় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বড় শিল্পগ্রুপগুলো কেমন করছে? ব্যাংকের করপোরেট ঋণে তার প্রভাব কতটা পড়েছে?
হোসেন খালেদ: আমাদের পারিবারিক ব্যবসার সূচনা ১৮৩৪ সালে। আমার মরহুম পিতা ও তাঁর সহযোদ্ধারা দেশের আর্থিক খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর গতিপ্রকৃতি আমি পারিবারিকভাবেও খুব কাছ থেকে দেখি। বাংলাদেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বলছে, আমাদের অর্থনীতির গতি নিম্নমুখী। আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন কর্মসংস্থান, সেটি খুব বেশি তৈরি হচ্ছে না। প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ লাখ ব্যক্তি কর্মসংস্থান উপযোগী হয়। আগে আমরা যে গতিটাতে ছিলাম, সেই গতি থেকে পিছিয়ে আছি। কিন্তু তারপরও বসে থাকার সময় নেই। এখন আমরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুই ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন সময়টা এমন, আগামী এক বছর এমনভাবে চলতে হবে, যেন পরের পাঁচ বছর ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি করতে পারি। দেশের অন্যতম চালিকা শক্তি হচ্ছে ব্যবসা। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভালো–মন্দ সব ধরনেরই ব্যবসায়ী থাকবেই। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর দৃঢ় অবস্থান জাতীয় অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধি সুদৃঢ় করবে।
এভাবে চোখের সামনে ব্যাংকগুলো লুটপাট হলো। এখন তো বিভিন্ন ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন অপরাধ কীভাবে রোধ করা যায়?
হোসেন খালেদ: এটা আসলে সবচেয়ে কষ্টকর এবং দুঃখের ব্যাপার যে আমাদের মতো একটা দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাকে সব সময় প্রশংসা করা হতো। ২০১৮ সালে এসে রক্ষক ও ভক্ষক এক হয়ে গেল। তখনই ব্যাংক খাতকে আর কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আমরা অনেকবার বলেছি এটা ভালো হচ্ছে না, এটাকে থামানো দরকার। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে যদি নির্দেশনা আসে, তাহলে কার সাধ্য থাকে সেটা থামানোর। চেকার ও মেকার, রক্ষক ও ভক্ষক যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথক থাকবে ততক্ষণ যেকোনো ব্যবসা বা অর্থনীতি ভালো থাকবে। যখনই এক ব্যক্তির জন্য বা কোনো দলের জন্য আপস করা হয়, তখনই খারাপ হতে শুরু করে। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব গভর্নর পেশাদার ছিলেন। গত তিন গভর্নর রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছিলেন। এটাই খারাপ হয়েছে। পেশাদার হওয়ায় আহসান এইচ মনসুর এক বছরের মধ্যে অনেক কাজ করে ফেলেছেন। খারাপ হতে যাওয়া অর্থনীতিকে তিনি টেনে তুলেছেন। ব্যাংক একীভূত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটাও খুবই ভালো উদ্যোগ।
সামনের দিনে সিটি ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান? আপনার পরিকল্পনাগুলো কী কী?
হোসেন খালেদ: আমরা সিটি ব্যাংককে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চাই, যেটি শুধু দেশের সেরা ব্যাংক নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। আমাদের মূল ফোকাস থাকবে চারটি ক্ষেত্রে—ডিজিটাল রূপান্তর, টেকসই প্রবৃদ্ধি, গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবন এবং দেশের সেরা ব্যাংক হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, ব্যাংকিং মানে শুধু আর্থিক সেবা নয়, বরং দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সহযাত্রী হওয়া। তাই সবুজ ও টেকসই প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো, করপোরেট সুশাসনকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়িক মডেলের মাধ্যমে আগামী দিনে সিটি ব্যাংককে আমরা এমন অবস্থানে নিতে চাই, যেখানে এটি দেশের গর্ব এবং আঞ্চলিকভাবে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।