আজ মঙ্গলবার সকালে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন সংগঠনের আহ্বায়ক নুর উন–নবী
আজ মঙ্গলবার সকালে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন সংগঠনের আহ্বায়ক নুর উন–নবী

দ্রুত পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের, গভর্নরকে স্মারকলিপি পেশ

ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ দ্রুত গঠন ও এস আলম গ্রুপের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। আজ মঙ্গলবার সকালে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে এ–সংক্রান্ত স্মারকলিপি দেন সংগঠনের নেতারা।

সংগঠনের আহ্বায়ক নুর উন–নবী স্বাক্ষরিত এই স্মারকলিপিতে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার, লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নরকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ ও সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের পর দেশজুড়ে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে অনেক গ্রাহক বিভিন্ন শাখা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। কোনো কোনো শাখা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা দিতে না পারায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

গ্রাহক ফোরামের অভিযোগ, ২০১৭ সালেম এস আলম গ্রুপ অবৈধভাবে শেয়ারহোল্ডারদের বাধ্য করে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কেড়ে নিয়েছিল। এরপর ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে বেনামি ঋণের নামে বিপুল অর্থ লোপাট করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে এবং প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা আমানত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সম্প্রতি ব্যাংকের পর্ষদ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু সিদ্ধান্তে সাধারণ গ্রাহকদের মনে আবার ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ পরিবারের সম্পদ নয়, এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠান। অনতিবিলম্বে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সাধারণ গ্রাহকেরা আমানত রক্ষায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।

৭ দফা দাবি

সংকট কাটাতে সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নিচের দাবিগুলো পেশ করা হয়েছে—

১. পেশাদার পর্ষদ গঠন

অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।

২. প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর

২০১৭ সালে কেড়ে নেওয়া মালিকানা ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি মালিকদের কাছে দ্রুত ফিরিয়ে দিতে হবে।

৩. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন

বিদায়ী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় এস আলমসহ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে তাদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. স্থিতিশীলতা ও অপপ্রচার রোধ

ব্যাংকিং খাতে আতঙ্ক দূর করতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকের বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচার রোধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত

বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে হবে।

৬. আইন সংশোধন

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮/ক ধারা সংশোধন করে চিহ্নিত লুটেরা, তাদের পরিবার ও সুবিধাভোগীদের ব্যাংকিং খাতের পরিচালক পর্ষদে আজীবনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

৭. সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার

জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রদত্ত বক্তব্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারায় গ্রুপটি। এর পর থেকে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যানসহ পাঁচ পরিচালকই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন। গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিন রাত ৯টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর গ্রাহক ফোরামের আন্দোলন শুরু হয়। জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বির্তক হয়। গ্রাহক ফোরামকে সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মধ্যে টাকা তোলার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসলামী ব্যাংককে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত রোববার রাতে চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে একদল গ্রাহক।