
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে ঋণখেলাপির তালিকায় নাম ছিল বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের। তিনি এখন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট—এ তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।
সিলেট সিটি করপোরেশন ও সিলেট সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর। সব প্রার্থীর ঋণের তথ্য যাচাই করে গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে দুটি তালিকা পাঠানো হয় নির্বাচন কমিশনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বরের হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
সিআইবির একটা তালিকায় ঋণখেলাপি হিসেবে ৮২ জনকে চিহ্নিত করা হয়। অপর তালিকায় ৩১ জনের নাম দেওয়া হয়, যাঁদের সবাই উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। দ্বিতীয় তালিকায় ছিল খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নাম। মানে হলো, তিনি আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন, জয়ী হয়েছেন, সংসদে গিয়েছেন এবং মন্ত্রীও হয়েছেন।
এভাবে ঋণখেলাপির তালিকায় নাম থাকা অনেকে এবারের সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে শুরুতে ৩১ জনকে সুযোগ দিয়েছিলেন আদালত। চূড়ান্ত বিচারে ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে বিএনপির মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর (কুমিল্লা-৪) প্রার্থিতা বাতিল হয়। তিনি নির্বাচন করতে পারেননি। বাকি ৩০ জন পেরেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৯ জন সংসদ সদস্য (এমপি) হয়েছেন, যাঁরা ইতিমধ্যে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির দুজন প্রার্থী বেসরকারি ফলাফলে জয়ী হয়েছেন। তবে নির্বাচন কমিশন এখনো তাঁদের নামে প্রজ্ঞাপন জারি করেনি। যদিও তাঁরা আশা করছেন, শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
ঋণখেলাপিদের সংসদে আসার সুযোগ করে দেওয়াটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হয়েছে।মইনুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। কিন্তু দেখা যায়, নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য প্রার্থীরা কিছু টাকা পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত করে ফেলেন। এবং আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়ে অনেকেই নির্বাচনে প্রার্থী হন। নির্বাচনে জিততে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা আর ঋণ পরিশোধ করেন না। জিতে গেলে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে প্রভাব তখন কাজে লাগে।
সব মিলিয়ে অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে আইন ঋণখেলাপিদের সবাইকে প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছে না। একবার নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কারও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঋণখেলাপি ও নির্বাচনী যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নামটি বিশেষভাবে আলোচিত। খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অংশ নেন এবং জয়ী হন। এ স্থগিতাদেশ ছিল সাময়িক। তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়নি। কারণ, মামলার নিষ্পত্তি হয় সংসদ সদস্য পদের মেয়াদ পাঁচ বছর শেষ হওয়ার পর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বরের হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এবার ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে এক শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঋণখেলাপি যাঁদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাঁদের পারমিট করেছে বিধায়।’
নির্বাচনের আগে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যাঁরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যই নন, আদালত কি তাঁদের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিলেন? তিনি ১৬ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে কেউ চাইবেন পাঁচ বছরই কাটিয়ে দিতে, এমনটা তো হতে পারে না। আর নির্বাচন করার আগে ঋণ নিয়মিত করাটাও বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে সামান্য টাকায় ঋণ নিয়মিত করে নির্বাচনের হিসাব-কিতাবই বদলে দিয়েছেন।
আমরা ঋণখেলাপি যাঁদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাঁদের পারমিট করেছে বিধায়নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাংকঋণ রয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে আবদুল মুক্তাদিরের ঋণ ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে ঋণ ট্রাস্ট ব্যাংকে ৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকে ৯৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঋণ তাঁদের। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এফএম ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডকে খেলাপি না দেখাতে আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল গত ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। আরেক প্রতিষ্ঠান মাগনুম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের জন্যও আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল গত ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। আদালত এ দুই প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানোর ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন নির্বাচনের আগে।
তবে গত ১৬ মার্চ মুঠোফোনে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ঋণ নিয়মিত হয়েছে নির্বাচনের আগেই। আর এফএম ইয়ার্ন ডায়িং এবং মাগনুম এন্টারপ্রাইজের তিনি কেউ নন, শেয়ারহোল্ডারও নন। ভুলভাবে এটিকে আদালতে তোলা হয়েছিল। আদালতের নজরে আনার পর আদালত তা নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে আইন ঋণখেলাপিদের সবাইকে প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছে না। একবার নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কারও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে বিজয়ী বিএনপির সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামে ৬৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। তাঁকে ঋণখেলাপি দেখানোর ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (নির্বাচনের পর ১১ দিন)।
নির্বাচনী হলফনামার তথ্য অনুযায়ী অগ্রণী ব্যাংকে ২৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকে ২০১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ১৬৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে ৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ঋণ গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।
যোগাযোগ করলে ১৭ মার্চ মুঠোফোনে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সব ঋণ নিয়মিত ছিল নির্বাচনের আগেই। টাকা জমা দেওয়ার পর ব্যাংকের পর্ষদে তা অনুমোদিত হতে হয়। এতে সময় লেগে যায়। এদিকে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছিল। ঝুঁকিমুক্ত থাকার জন্য আমি তাই আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছিলাম।’
চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানো যাবে না—এমন আদেশ আদালত দিতেই পারেন। তবে সময়টা সীমাহীন না হওয়াই ভালো। আমি চাই, ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে না পারা ব্যক্তিরা যত কম এমপি হতে পারেন। আইনপ্রণেতারা যদি টাকা নিয়ে ফেরত না দেন, তাতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, বিনিয়োগ কম হয়, কর্মসংস্থান কম হয় এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে।সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক
সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-১ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন কাজী রফিকুল ইসলাম। তাঁকে ঋণখেলাপি দেখানোর ওপর স্থগিতাদেশের একটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৫ জানুয়ারি। অপর একটির স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৭ মার্চ। আরেকটির স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ এপ্রিল।
বেসরকারি দুটি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় কাজী রফিকুল ইসলাম অন্তত ৭৬৫ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হন। এ জন্য শুরুতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন তিনি। পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে সুযোগ পান।
যোগাযোগ করলে কাজী রফিকুল ইসলাম গত ১৬ মার্চ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করেছি। ফলে স্থগিতাদেশের বিষয়টি এখন আর প্রযোজ্য হবে না।’
নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা মিলে গঠিত কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জমজম কার অ্যান্ড অটোমোবাইল। এর মালিক ও জামিনদাতা হিসেবে তিনি ঋণখেলাপি। আবার জমজম ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড নামের আরেকটির পরিচালক হিসেবেও ঋণখেলাপি তিনি। দুটি প্রতিষ্ঠানই ব্যাংক এশিয়া থেকে ঋণ নিয়েছিল।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ঋণখেলাপি ও দলীয় প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়ায় গত ৩ জানুয়ারি বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। এর বিরুদ্ধে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। শুনানি নিয়ে নির্বাচন কমিশন গত ১৮ জানুয়ারি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার আপিল নামঞ্জুর করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ১৯ জানুয়ারি তিনি হাইকোর্টে রিট করেন।
মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ঋণখেলাপি ও দলীয় প্রত্যয়ন নেই—এ দুই গ্রাউন্ডে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। মোবাশ্বের আলম গত ১০ ডিসেম্বর এককালীন অর্থ পরিশোধ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ ডিসেম্বরের আগেই ঋণ পুনঃ তফসিল হয়। ফলে তিনি খেলাপি নন।
বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৫ আসন। এ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। হলফনামায় তিনি নিজের নামে মাত্র ২৭ লাখ টাকা এবং স্ত্রী শাহনাজ সিরাজের নামে ৪ লাখ টাকা ঋণের কথা উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ঋণ।
এর মধ্যে ক্যাব এক্সপ্রেস বিডির নামে ২৬ কোটি টাকা, ওয়ানটেল কমিউনিকেশনের নামে ৪৮ কোটি টাকা এবং এসআর হাইওয়ে সার্ভিসেসের নামে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটির চেয়ারম্যান এবং একটির পরিচালক।
শাহনাজ সিরাজের মালিকানাধীন এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৫১২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছিল। একই প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এসব বিষয়ে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটির স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, আরেকটির শেষ হয় ১৬ মার্চ। অপর দুটি মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
যোগাযোগ করলে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ তাঁর আইনজীবী সৈয়দা নাসরিনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। সৈয়দা নাসরিন গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের ঋণ নিয়মিত ছিল। সিআইবি হালনাগাদ হতে সময় লাগছিল বলে আমরা ঝুঁকি নিতে চাইনি। এ কারণেই আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেওয়া।’
মুক্তাগাছা উপজেলা নিয়ে ময়মনসিংহ-৫ আসন। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন। হলফনামা অনুযায়ী তিনি এবং তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে দুটি বেসরকারি ব্যাংকে প্রায় ৯৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। এর মধ্যে এনআরবি ব্যাংকে ৩২ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকে ৬৫ কোটি টাকা। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের আগেই আগামী ৬ জুন পর্যন্ত তাঁকে ঋণখেলাপি না দেখাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন আদালত।
জানতে চাইলে মোহাম্মদ জাকির হোসেন ১৭ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, ৬ জুন পর্যন্ত স্থগিতাদেশ থাকলেও নির্বাচনের আগেই তিনি সব ঋণ নিয়মিত করেছেন এবং আইন অনুযায়ী তিনি আর ঋণখেলাপি নন।
সীতাকুণ্ড ও পাহাড়তলী নিয়ে এই আসন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন ধানের শীষ প্রতীকে আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়েছেন। আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। তবে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নামে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নিজের নামে, জামিনদার হিসেবে ও পরিচালক হিসেবে পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিজের ও অন্যান্য মিলে তাঁর ঋণ রয়েছে ৩৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। জামিনদার হিসেবে তাঁর ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে ঋণ ২৮৫ কোটি টাকা। সিআইবিতে তাঁর ঋণখেলাপি না দেখানোর ওপর প্রথমে গত ১৯ ও ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি নির্বাচনের আগেই আবার আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পান।
নির্বাচনের দিন গত ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আসলাম চৌধুরীর বিষয়টি ঝুলে ছিল। সকালে নির্বাচন কমিশন আদেশ দেয় যে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশ অনুযায়ী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন এবং তিনি তা করেছেনও। তবে আপিল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত থাকবে বলে জানানো হয়। মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা কিন্তু দিয়ে দিয়েন।’
আসলাম চৌধুরী ১৬ মার্চ প্রথম আলোকে জানান, ‘ব্যাংকঋণের অর্থ আংশিক পরিশোধ করেছি। আর ঋণখেলাপি না দেখানোর জন্য আদালত থেকে নতুন করে স্থগিতাদেশ পেয়েছি আরও ছয় মাসের জন্য। সুবিধার দিক হচ্ছে, ব্যাংক মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। একটা প্রক্রিয়া চলছে। ফলে যেকোনো সময়ই এমপি হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে আশা করছি।’
চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলা নিয়ে এই আসন। বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে সরোয়ার আলমগীর ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়েছেন। বিপরীতে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন পেয়েছেন ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। এর ফলাফলও স্থগিত রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
সারোয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন কোম্পানির নাম এনএফজেড টেরি টেক্সটাইল। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ২০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল এ কোম্পানির নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় বলা হয়েছে, ‘সিআইবিতে ঋণখেলাপি দেখানোর বিষয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে, যার মেয়াদ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।’
সারোয়ার আলমগীরের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, সারোয়ার আলমগীর নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন নির্বাচন কমিশনও একই আদেশ দেয়। নির্বাচন কমিশন ওই দিন বলেছিল, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরোয়ার আলমগীরের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে।
সারোয়ার আলমগীর ১৭ মার্চ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকের ঋণ তাঁর নিয়মিত আছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের কোনো মামলা নেই। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা করা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে, যার ৪টিতে তারা হেরে গেছে। বাকি একটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার দিন আগামী ২৮ এপ্রিল। আশা করছি, নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’
লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৯ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী হয়েছেন মো. আবুল কালাম, কালিহাতী উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৪ আসনে বিএনপি থেকে লুৎফর রহমান ওরফে মতিন এবং শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী হয়েছেন মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
আবুল কালামের ঋণ খেলাপি দেখানোর ওপর আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ রয়েছে আদালতের। লুৎফর রহমানের স্থগিতাদেশ রয়েছে আগামী ২৪ মে পর্যন্ত। আর মুজিবুর রহমান চৌধুরীর ব্যাপারেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ঋণখেলাপি দেখানো যাবে না মর্মে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে।
ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে জাতীয় পার্টির (একাংশ) নেতা ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী মুজিবুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুজিবুর রহমান শামীম, জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম সরোয়ার, এলডিপির মো. হাসান ইমামসহ অনেকেই নির্বাচন করতে পারেননি।
পুরো চিত্র তুলে ধরে গত ১৬ মার্চ প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের কাছে। তিনি বলেন, সমাজে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আছেন, তবে ইচ্ছাকৃতদের ধরা মুশকিল। কেউ কেউ আবার ব্যবসা করতে না পারার কারণেও ঋণখেলাপি হন। কেউ আবার অন্যের জামিনদার হয়ে নির্বাচন করায় অযোগ্য হয়ে পড়েন। ফলে আদালতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারলে আদালত সুবিচার করেন এবং স্থগিতাদেশ দেন। এবারও তা-ই হয়েছে।
শাহদীন মালিক বলেন, ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানো যাবে না—এমন আদেশ আদালত দিতেই পারেন। তবে সময়টা সীমাহীন না হওয়াই ভালো। আমি চাই, ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে না পারা ব্যক্তিরা যত কম এমপি হতে পারেন। আইনপ্রণেতারা যদি টাকা নিয়ে ফেরত না দেন, তাতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, বিনিয়োগ কম হয়, কর্মসংস্থান কম হয় এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে।’
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে কোনো কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল, যাঁরা এবার জয়ী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আসলাম চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আসলাম চৌধুরী ২০১৮ সালে ভোটের আগের দিন আদালতের নির্দেশে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তখন তাঁর প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ মোরসালিন। দেখা যাচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে ঋণখেলাপি থাকা অনেকে সামান্য কিছু টাকা ব্যাংকে দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঋণখেলাপিদের সংসদে আসার সুযোগ করে দেওয়াটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হয়েছে। যত দূর জানি, সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তা ঠেকানোর চেষ্টা করেও পারেননি। ফলে ২ শতাংশ নগদ জমার সুযোগটি নিয়েই একশ্রেণির ব্যবসায়ী আজ সংসদ সদস্য হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ঋণখেলাপিদের প্রতি নতুন সরকার ও নতুন গভর্নরের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা ব্যাংক খাত তথা অর্থনীতির জন্য ভালো মনে হচ্ছে না।