একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের মুনাফা কেটে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রীতি মেনে মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ করার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে আমানতকারীরা এ সময়ের মুনাফা পাবেন না।
যাঁরা ইতিমধ্যে এ সময়ের মুনাফা তুলে নিয়েছেন, তাঁদের মুনাফার সমপরিমাণ অর্থ আমানত থেকে কেটে রেখে হেয়ারকাট পদ্ধতি কার্যকর করা হবে। বিশ্বজুড়ে ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ায় হেয়ারকাট-প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। ব্যাংক সংকটে পড়লে বা একীভূত করার উদ্যোগে এ প্রক্রিয়া মানা হয়। বাংলাদেশও একই পথ বেছে নিয়েছে।
যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত হচ্ছে, সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে।
পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। অন্য চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও সমালোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা দুজনেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে ও বেনামে তাঁদের শেয়ার রয়েছে, ঋণের সুবিধাভোগীও তাঁরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই বছরে মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ১০ হাজার কোটি টাকার দায় কমে যাবে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাঁচ ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে পাঁচ ব্যাংকের আমানত কমে হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখা হলে তা কমে হবে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। এতে লুটপাটের অভিযোগ থাকা উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি পাঁচ ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারও শূন্য হয়ে পড়ে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয়, প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ঋণাত্মক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা হয়ে পড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি আমানতকারীও ক্ষতিতে পড়ল। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এতে এস আলম ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের গোষ্ঠীর লুটপাটের দায় পড়ল বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের ওপর।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। চলতি সপ্তাহে এই নিয়োগ হতে পারে। এরপর নতুন ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা, কোম্পানি সচিবসহ শীর্ষ কয়েকটি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এরপর পাঁচ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ও মামলা নেই, তাঁদের নতুন ব্যাংকে কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। অন্যরা বাদ পড়বেন। পাশাপাশি চলবে পাঁচ ব্যাংকের দায় ও সম্পদ এক সফটওয়্যারে সংযুক্ত করার কাজ। নতুন ব্যাংকটি আরও গ্রাহক ও আমানত টানতে উদ্যোগ নেবে নতুন কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি নতুনভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে। সব ব্যাংকের গ্রাহকদের যুক্ত করার পর তাঁদের নতুন ব্যাংকের হিসাব ও চেক বই দেওয়া হবে। এরপর ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে পাঁচ ব্যাংকের নাম। তখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে পরিচিতি পাবে পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহক, কর্মীসহ সবাই। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লেগে যাবে বলে জানিয়েছেন একীভূত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমানতকারীদের আস্থা অর্জন করা। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রীতি ও নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য ব্যাংকটিকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে অভিনব বিপণন কৌশলও নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকটির খেলাপি হয়ে যাওয়া সম্পদ কতটা উদ্ধার হলো, এদিকেও নজর রাখবে গ্রাহকেরা। তাই সব ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।
তবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সুবিধা হলো ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। শেয়ার রূপান্তরের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনে রূপান্তর করা হবে। ব্যাংকটির অর্ধেক পরিচালক স্বতন্ত্র হবেন। এখন চ্যালেঞ্জ সঠিক পণ্য ও প্রচারণা নিয়ে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, শুরুতে সরকার মূলধন জোগান দিলেও তিন বছর পর ব্যাংকটির শেয়ার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন সরকার মূলধন ফেরত পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক একীভূত সারা পৃথিবীতে হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও হচ্ছে, এটা ভালো। তবে প্রশ্ন হলো যারা লুটপাট করল, তাদের কতটা শাস্তি হলো বা টাকা কতটা আদায় হলো। নতুন ব্যাংকটি পেশাদারির সঙ্গে পরিচালনা করলে ভালো করতে পারে। এ জন্য পূর্ণ পেশাদারদের ব্যাংকারদের দিয়ে ব্যাংকটি পরিচালনা করতে হবে। অন্য সরকারি ব্যাংকের মতো এটাও একইভাবে চলুক, এটা কারও কাম্য নয়। এ ছাড়া ব্যাংকটির পরিচালনা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে।