প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে জনজীবন ওষ্ঠাগত। ঘরের বাইরে আগুনের হলকা, আর ভেতরে একটু প্রশান্তির আশায় দিনরাত চলছে এয়ারকন্ডিশনার (এসি)। কিন্তু মাস শেষে যখন বিদ্যুৎ বিল হাতে আসে, তখন সেই প্রশান্তি নিমেষেই উদ্বেগে রূপ নেয়। সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—কীভাবে এসি চালিয়েও বিদ্যুৎ বিল রাখা যায় সাধ্যের মধ্যে? জ্বালানিবিশেষজ্ঞ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় এসি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এর সহজ সমাধান হলো এসির তাপমাত্রা ‘২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস’ রাখা।
অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, তাপমাত্রা ১৬ বা ১৮ ডিগ্রিতে দিলে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। এসির তাপমাত্রা যত কমানো হয়, কম্প্রেসরকে ঘর সেই তাপমাত্রায় নামিয়ে আনতে তত বেশি সময় ধরে ও শক্তিশালীভাবে কাজ করতে হয়। এতে বিদ্যুৎ খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
দেশি ইলেকট্রনিকস কোম্পানি ইলেকট্রো মার্ট, ওয়ালটন, ভিশন, ট্রান্সটেক, ইলেকট্রা, এলিট–হাইটেক ও মিনিস্টারের দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মানুষের শরীরের জন্য ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সবচেয়ে আরামদায়ক। ‘এআই ডক্টর’ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ইনভার্টার এসিগুলো ২৫ ডিগ্রিতে সেট করলে কম্প্রেসর খুব অল্প শক্তিতে চলে ঘরকে শীতল রাখে, যা বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে দেশে প্রতিবছর তাপমাত্রা বাড়ছে। আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল পরামর্শ দেন, সবাই যদি এসি ২৫ ডিগ্রিতে চালায়, তবে দেশে বিদ্যুতের যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়, তা প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
বর্তমানে বাজারের ৯৫ শতাংশ এসিই ইনভার্টার প্রযুক্তির। ভিশন, ইলেক্ট্রা ও ট্রান্সকমের (প্যানাসনিক ও হায়ার) তথ্য অনুযায়ী, ইনভার্টার এসি যখন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন এটি পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে খুব ধীরগতিতে চলতে থাকে। এতে বারবার কম্প্রেসর স্টার্ট হওয়ার ঝামেলা থাকে না, ফলে বিদ্যুতের অপচয় হয় না। ট্রান্সকমের এসিতে ব্যবহৃত স্মার্ট সেন্সর ও ইকো-ফ্রেন্ডলি আর৩২এ গ্যাস এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।
এসি ২৫ ডিগ্রিতে রাখার পাশাপাশি সেটি পরিষ্কার রাখা বিল কমানোর অন্যতম শর্ত। যমুনা ইলেকট্রনিকসের দেওয়া তথ্যমতে, এসির কয়েল বা ফিল্টারে ধুলাবালু জমলে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে ঘর ঠান্ডা হতে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। যমুনার তৃতীয় প্রজন্মের ইউভিসি লাইট ও সেলফ-ক্লিনিং প্রযুক্তি এসিকে ভেতর থেকে পরিষ্কার রেখে দক্ষতা বজায় রাখে।
এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ কম তাপমাত্রায় (যেমন ১৮ ডিগ্রি) এসি চালালে ত্বক শুষ্ক হওয়া বা জয়েন্টে ব্যথার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। গ্রী এসির হিউমিডিটি কন্ট্রোলার প্রযুক্তি ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বাতাসের আর্দ্রতা সঠিক রেখে শরীরকে সুস্থ রাখে।
১. এসি চালানোর সময় রুমের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখুন এবং ভারী পর্দা ব্যবহার করুন।
২. এসি চালানোর শুরুতে কিছুক্ষণ ফ্যান চালিয়ে গরম বাতাস বের করে দিন, এরপর ২৫ ডিগ্রিতে এসি চালু করুন।
৩. ১৫ দিন অন্তর এসির ফিল্টার নিজে পরিষ্কার করুন এবং বছরে অন্তত দুবার প্রফেশনাল সার্ভিসিং করান।
আপনার এসিকে ‘পাগলা ঘোড়া’ হতে না দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার চাবিকাঠি আপনার হাতেই। ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কেবল আপনার পকেটই বাঁচাবে না, বরং পরিবেশ রক্ষা ও জাতীয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখবে। স্বস্তি আর মিতব্যয়িতার এ ভারসাম্যই হোক এবারের গ্রীষ্মের সমাধান।