
থিয়েটার, নাটক, সিনেমার মতো সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। ফলে গানের আয়োজন কিংবা মঞ্চনাটক বা থিয়েটার—এসব এখন মানুষ টাকা খরচ করে দেখছেন কম। এ কারণে এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও কমে গেছে। এর বিপরীতে সার্কাস, ব্যান্ড শোর আয়োজন টাকা খরচ করে দেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। ফলে এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের আয়ও নাটক, সিনেমা ও গানের আয়োজনের চেয়ে বেশি।
শিল্প ও বিনোদন মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ৩১৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ বা সমীক্ষা চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস। সংস্থাটির জরিপে বেরিয়ে এসেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সার্কাস, ব্যান্ড শো বা অর্কেস্ট্রার মতো আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করেছে প্রায় ২২ কোটি টাকা। সেখানে গান, নাচ, অপেরাসহ সৃজনশীল নানা লাইভ সাংস্কৃতিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ছিল মাত্র ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা।
বিবিএস শিল্প ও বিনোদন খাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও অবদানকে মূল্যায়নের জন্য এই সমীক্ষা করেছে। গত বছরের জুন-জুলাইয়ে এই সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষার জন্য ভিত্তি ধরা হয় ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪—এই দুই অর্থবছরকে। বিবিএস বলছে, এর আগে এসব খাত নিয়ে কখনো এ ধরনের সমীক্ষা করা হয়নি। সমীক্ষায় যত প্রতিষ্ঠানের তথ্য নেওয়া হয়েছে, তা হয়তো পুরো খাতকে প্রতিনিধিত্ব করে না কিন্তু এসব খাত সম্পর্কে একটি ধারণা দেয় বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে। সমীক্ষায় সিনেমা নিয়ে আলাদা কোনো তথ্য উল্লেখ নেই।
এদিকে বিবিএসের সর্বশেষ জিডিপির তথ্য অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে শিল্প ও বিনোদন খাতের অবদান শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। আর্থিক মূল্যে যার পরিমাণ ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। বিবিএস বলছে, সার্বিকভাবে জিডিপিতে শিল্প ও বিনোদন খাতে প্রতিবছর সামান্য পরিমাণে বাড়লেও গান, নাচ, থিয়েটারসহ সৃজনশীল খাতগুলোর অবস্থা খুব বেশি ভালো না।
দেশের নাটক, থিয়েটারসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি ও বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া এই খাত থেকে আর্থিক মূল্যে দৃশ্যমান বড় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এ খাতের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্টজনেরা বলছেন, গান, নাচ, থিয়েটারের মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক মূল্য পেতে হলে সবার আগে দরকার এসব খাতে বিনিয়োগ। আমাদের দেশে সেই বিনিয়োগের বড় ঘাটতি রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড যাঁরা করেন, তাঁরা বেশির ভাগ স্বেচ্ছাশ্রমে নিজেদের অর্থে এসব কাজ করেন। তাই যেখানে সরকারি-বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নেই, সেখান থেকে আর্থিক রিটার্নও খুব বেশি হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে শুধু আর্থিক মূল্যে বিবেচনা করলে হবে না। কারণ, এটির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি, সভ্যতা, মননশীলতা, মানসিক বিকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় জড়িত। তাই এসব কর্মকাণ্ডের আর্থিক মূল্যের চেয়ে জাতিগত ও সামাজিক মূল্য সংযোজন অনেক বেশি। তা ছাড়া এ ধরনের আয়োজন নিয়ে দেশের ভেতরে নানা ধরনের সামাজিক চাপ, বাধা ও নানা নেতিবাচক প্রচারণাও রয়েছে। এসব কারণেও দিন দিন সাধারণ মানুষ এ ধরনের অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পারিবারিক পর্যায়ে সন্তানদের সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগও আগের চেয়ে কমে গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, দেশের নাটক, থিয়েটারসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি ও বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া এই খাত থেকে আর্থিক মূল্যে দৃশ্যমান বড় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে সাংস্কৃতিক এসব কর্মকাণ্ডের আর্থিক মূল্যের চেয়ে অন্যান্য মূল্য সংযোজন অনেক বেশি, যা সমাজ ও জাতি গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। এ খাতের আর্থিক মূল্য বাড়াতে হলে সবার আগে দরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিনিয়োগ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাত থেকে ২২ কোটি টাকা আয় করেছে। একই অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় এসেছে জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো থেকে। এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ওই বছর দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১৯ কোটি টাকার বেশি আয় করেছিল। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ উদ্যান কিংবা সরকারি-বেসরকারি স্পোর্টস ক্লাব, বিনোদন পার্ক, থিম পার্কগুলো আয় হয়েছে ৪ কোটি টাকার বেশি।
সামিনা লুৎফা বলেন, সমীক্ষায় এই খাতের আয়ের তথ্য উঠে এলেও বিনিয়োগের কোনো তথ্য নেই। তাই কত অর্থ বিনিয়োগে কত আয় হচ্ছে, সেই তুলনা করা যাচ্ছে না।
বিবিএস বলছে, তাদের কাছে শিল্প ও বিনোদন মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি ১০ হাজার ১৯টি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে ৩১৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর সমীক্ষাটি করা হয়েছে।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প ও বিনোদনের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয়ের উৎস সার্কাস, অর্কেস্ট্রা ও ব্যান্ড সংগীত খাত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাত থেকে ২২ কোটি টাকা আয় করেছে। একই অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় এসেছে জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো থেকে। এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ওই বছর দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১৯ কোটি টাকার বেশি আয় করেছিল। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ উদ্যান কিংবা সরকারি-বেসরকারি স্পোর্টস ক্লাব, বিনোদন পার্ক, থিম পার্কগুলো আয় হয়েছে ৪ কোটি টাকার বেশি।
বিবিএস জানায়, শিল্প ও বিনোদন খাতে নাটক, গান, কনসার্ট, নৃত্য, অপেরা প্রভৃতি আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় তুলনামূলক অনেক কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ লাখ টাকা। যেখানে জাদুঘর বা ব্যান্ড সংগীত আয়োজনে কোটি কোটি টাকা আয় হয়, সেখানে গান, নাটকের মতো খাত থেকে আয় কয়েক লাখ টাকা।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৭টি ছিল সরকারি মালিকানাধীন। এ ছাড়া ৭৫টি একক মালিকানার, ৫০টি অংশীদারত্ব মালিকানার, ২০টি পারিবারিক অংশীদারি মালিকানার এবং ৬টি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। এর বাইরে ৮০টি প্রতিষ্ঠান ছিল, যাদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানমালিকের সংখ্যা ছিল ৫৮০ জন, যাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশই পুরুষ। অর্থাৎ শিল্প ও বিনোদন খাতের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ কম। এ ছাড়া সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩১৮ প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মসংস্থান ছিল ছয় হাজারের কিছু বেশি।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, শিল্প ও বিনোদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো খরচের একটি বড় খাত কর্মসংস্থান ব্যয় (স্থায়ী কর্মীর বেতন–ভাতা)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেতন বাবদ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় ছিল ৮৫ কোটি টাকা। এর বাইরে বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানিসহ বিভিন্ন পরিষেবা বিল; শিল্পী সম্মানী, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা, নিবন্ধন, ভাড়া, ইন্টারনেট, স্টেশনারি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও রয়েছে। এসব খাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বছরে ২৬-২৭ কোটি টাকা। সমীক্ষার তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ছিল ৫৫ কোটি টাকা।
বিবিএস বলছে, শিল্প ও বিনোদন খাতে জাদুঘর, পার্ক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পাবলিক লাইব্রেরি ও শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানই পরিসরে বড়। তারা সরকারি তহবিল পায়, যার বড় অংশ ব্যয় হয় কর্মীদের বেতন ও ভাতায়; এর বিপরীতে আয় কম। কারণ, সরকার টিকিটসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধায় ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এ জন্য সার্বিকভাবে শিল্প ও বিনোদন খাতে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি।
বিবিএসের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে মানুষ শিল্প ও বিনোদন খাতে তুলনামূলক বেশি ব্যয় করেন। সে তুলনায় গ্রীষ্মের সময়ে এসব খাতে ব্যয় কম করেন।
দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশের জন্য বর্তমান বিএনপি সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন কর বাড়াতে চায়। এ জন্য সরকারিভাবে নানা পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারিভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে এ খাতের জন্য আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে বাজেটে।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সাংস্কৃতিক ও অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্য এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পর্যটন উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জাতীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব, আঞ্চলিক উৎসব এবং নদী ও সভ্যতাভিত্তিক বৈচিত্র্যময় আয়োজনকে অন্তর্ভুক্ত করে মাসভিত্তিক ও থিমভিত্তিক জাতীয় এবং আঞ্চলিক ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হবে। কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উপখাত হিসেবে আর্ট বা কলা, সংগীত ও থিয়েটারভিত্তিক বিশেষায়িত অঞ্চলও গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে শিল্পী ও কলাকুশলীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং মানুষের বিনোদনের সুযোগ বাড়বে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনীতিতে বিনোদন খাতের আরও বেশি অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, সৃজনশীল খাত থেকে বড় সাফল্য পেতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে এই খাতে সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। আজ ভারত ও কোরিয়ার সিনেমা-নাটক যে বিশ্বজুড়ে দাপট দেখাচ্ছে, তা রাতারাতি হয়নি। এই দেশগুলো তাদের সৃজনশীল অর্থনীতি ও প্রশিক্ষণের পেছনে কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। সৃজনশীল খাতকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। টেকসই সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য একে একটি বৃহৎ পরিসরে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতি ও বিনিয়োগের আওতায় আনতে হবে।