বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার দেউলি গ্রামে ২৫ শতক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেছেন সাইফুল ইসলাম। ফল বিক্রির পাশাপাশি তিনি এ মৌসুমে চার লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। স্ট্রবেরিখেতে কাজ করছেন কৃষক সাইফুল ইসলাম
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার দেউলি গ্রামে ২৫ শতক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেছেন সাইফুল ইসলাম। ফল বিক্রির পাশাপাশি তিনি এ মৌসুমে চার লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। স্ট্রবেরিখেতে কাজ করছেন কৃষক সাইফুল ইসলাম

কৃষি খাত

২ বছরেই স্ট্রবেরির উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ

  • চাহিদা ও দামের উল্লম্ফন, চাষে ঝুঁকছেন কৃষক।

  • প্রতি বিঘায় খরচ দেড়-২ লাখ, বিক্রি ৪-৫ লাখ টাকার বেশি

  • রাবি-২ জাত সবচেয়ে জনপ্রিয়, এসেছে নতুন ‘ফ্রিডম-২৪’

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ শীর্ষে, বাড়ছে আবাদ

দেশি ফলের মতোই এখন বাজারে স্ট্রবেরি পাওয়া যাচ্ছে। মূলত শীতপ্রধান দেশের ফল হলেও দেশে গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে এটির উৎপাদন বাড়ছে। শুরুতে বাজার ছোট থাকলেও স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে ফলটির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ফলে প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। গত দুই বছরে ফলন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এর ওপর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা এটি চাষে ঝুঁকছেন।

তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্রবেরি অতি পচনশীল ফল। দু-এক দিনের বেশি তাজা রাখা যায় না। প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে না ওঠায় দীর্ঘ মেয়াদে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা শীতপ্রধান দেশের ফল হওয়ায় দু-এক দিনের বেশি তাজা রাখা যায় না। আমাদের দেশে কোল্ড চেইন না থাকায় বাজারজাত করা কিছুটা কঠিন। তবে এ ফলের স্বাদ ও গন্ধ ভালো। আইসক্রিমে ব্যবহার এবং বাণিজ্যিকভাবে জুস তৈরি করা গেলে ভালো সাড়া পাওয়া যাবে।’

লাল রঙের কারণে শিশুরাও ফলটি ভীষণ পছন্দ করে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একজন ক্রেতা প্রথম আলোকে জানান, কার্টনে দেখে তাঁর ছেলে স্ট্রবেরি পছন্দ করেছে। খেলার ছলেও খাওয়ানো যায় বলে নিয়মিত কিনতে হয়। মাসখানেক আগেও প্রতি কেজির দাম ছিল আড়াই হাজার টাকার মতো। এখন অনেকটা কমেছে। তবে বর্তমান দামকেও বেশি বলছেন অনেক ক্রেতা।

উৎপাদন বেড়েছে দ্রুত

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিসিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে স্ট্রবেরি উৎপাদন হয়েছিল ২১০ টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৫৮ টনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে ৪৩৫ টনে উঠেছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, স্ট্রবেরি আবাদে জমির পরিমাণ বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে দেশে ২২ একর জমিতে এটির চাষ হয়েছে, সেখানে গত অর্থবছরে তা বেড়ে ১৩০ একরে উন্নীত হয়েছে।

দরদাম ও মুনাফা

রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি এখন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাতের বেলায় দাম কিছুটা কমে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় নেমে আসে। বিক্রেতা মুস্তাক মিয়া জানান, ভরা মৌসুমে দাম কমে আসে, যদিও শুরুতে দুই হাজার টাকাতেও বিক্রি হয়। মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এই ফলের সবচেয়ে বড় চালান আসে। বাজারে দেশি ফলের পাশাপাশি ভারতীয় স্ট্রবেরি বিক্রি হয় প্রায় তিন হাজার টাকা কেজি দরে। অতি পচনশীল হওয়ায় দামে দ্রুত ওঠানামা দেখা যায়।

কৃষকেরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি আবাদে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। ফল বিক্রি করে পাওয়া যায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি। ফলে খরচের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি লাভ হচ্ছে।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার দেউলি গ্রামে ২৫ শতক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেছেন সাইফুল ইসলাম। ফল বিক্রির পাশাপাশি তিনি এ মৌসুমে চার লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। প্রতিটি চারা বিক্রি করেন ২০ থেকে ৩০ টাকায়। তিনি বর্তমানে মাঠে প্রতি কেজি ফল ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন। গত সপ্তাহে পাইকারিতে বিক্রি করেছেন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। মৌসুমের শুরুতে আগাম ফল অবশ্য ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। তবে মৌসুমের শেষ দিকে পাইকারি দাম ৩০০ টাকায় নামতে পারে বলে জানান তিনি।

উৎপাদনে শীর্ষ এলাকা

দেশের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ হয়। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এরপর রয়েছে জয়পুরহাট, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও নওগাঁ।

কৃষকেরা জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে স্ট্রবেরির চারা রোপণ করা হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ফুল আসতে শুরু করে। আর ডিসেম্বরের শেষ ভাগ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ইয়াছিন আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রাথমিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন কৃষকেরা নিজেরাই চারা উৎপাদন করে চাষ করতে পারছেন। আমরা পলিহাউস তৈরি করে দিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।’ তিনি জানান, ২০১৫ সালে চাষ শুরু হলেও দুই-তিন বছরে ফলটি বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর পেছনে মুনাফাই প্রধান ভূমিকা রাখছে।

উৎপাদনের শুরু

স্ট্রবেরির আদিনিবাস ইতালির রোম। স্বাদ ও উপকারিতার কারণে দ্রুতই তা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সে ফলটির বিশেষ কদর রয়েছে। বাংলাদেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেনের হাত ধরে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষের সূচনা হয়।

অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেন দেশে মিষ্টি স্বাদের স্ট্রবেরির জাত উদ্ভাবন করেন। ১৯৯৬ সালে জাপানে পিএইচডি করতে গিয়ে তিনি স্ট্রবেরি নিয়ে গবেষণা দেখেন। দেশে ফেরার সময় কয়েকটি জাত আনতে চাইলে তাঁর এক জাপানি বন্ধু সহযোগিতা করেন। তখন থেকেই তাঁর গবেষণার শুরু। ২০০৭ সালে তিনি নিজস্ব জাত উদ্ভাবন করেন। পরে রাবি-১, রাবি-২ ও রাবি-৩ নামে তিনটি জাত উদ্ভাবন করেন। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে রাবি-২ জাতের।

মনজুর হোসেন জানান, গত বছর তিনি ‘ফ্রিডম-২৪’ নামে নতুন একটি সুপার ভ্যারাইটি বা মেগা জাত উদ্ভাবন করেছেন। বাণিজ্যিকভাবে তিনিই প্রথম দেশে স্ট্রবেরির জাত নিয়ে আসেন। বাজারে অবশ্য ভারত আর থাই জাতের স্ট্রবেরিও রয়েছে।

বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মো. মনজুর হোসেন বলেন, এখনো কৃষি প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করেনি। তবে ভবিষ্যতে জুস ও জেলি তৈরি হতে পারে। ভালো লাভ পাওয়ায় কৃষকেরা উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। তবে সরকারিভাবে স্ট্রবেরি চাষ সম্প্রসারণে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।