২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। বিপরীতে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে প্রায় ৯ লাখ। নতুন কাজের প্রতি ১০টির ৭টিই তৈরি হয়েছে কৃষিতে। শিল্প খাতে বরং কর্মসংস্থান কমেছে।
অথচ আগের এক দশকে দেশের অর্থনীতি বছরে গড়ে ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধির সুফলও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমানভাবে ছড়ায়নি। উৎপাদনশীলতায় শীর্ষ ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রির ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু কর্মসংস্থানে তাদের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় হওয়ার পথে বাধা হয়ে আছে জটিল সরকারি প্রক্রিয়া, অর্থায়নের অভাব, অসম প্রতিযোগিতা ও বিদ্যুৎ–সংকট। সরকারি নিয়মকানুন সামলাতেই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় চলে যায়। আবার ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের মুখে পড়ে। এতে তাদের বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনের বিশেষ একটি অধ্যায়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়ন হলো, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়েনি। বিক্রি, রপ্তানি ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাও ক্রমে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এই বিশেষ অধ্যায়ের শিরোনাম ‘কর্মসংস্থান বাড়াতে কেমন ব্যবসার পরিবেশ প্রয়োজন’।
অধ্যায়টি একক জরিপের ভিত্তিতে তৈরি নয়। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য এসেছে ২০২২ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এন্টারপ্রাইজ সার্ভে’ থেকে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে ‘বিজনেস রেডি ২০২৫’, ‘বিজনেস অব দ্য স্টেট ২০১৯’, ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক ২০২৫’ এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার বিনিয়োগের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
২০১৫–১৬ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশ ছিল। তবে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবসা তৈরিতে একই রকম অগ্রগতি হয়নি।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ৯ লাখ নতুন কাজ হয়েছে। অথচ প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। নতুন কাজের প্রতি ১০টির প্রায় ৭টিই হয়েছে কৃষিতে। শিল্প খাত উল্টো কর্মী হারিয়েছে।
নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ। এ সময়ে নারীদের জন্য কৃষিতে ৪২ লাখ নতুন কাজ তৈরি হয়েছে। তবে শিল্পে ১১ লাখ এবং সেবা খাতে ৮ লাখ কাজ কমেছে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থাকে ‘উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য’ বলা হয়েছে। একদিকে সামগ্রিক অর্থনীতি বেড়েছে। অন্যদিকে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা একই গতিতে বাড়েনি।
বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীপ্রতি আয় দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক মানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেন সেবা খাতে। এই খাতে ২০১৬ সালের পর শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে আছে।
নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির গতিও কম। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৮ শতাংশ গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীনে এই হার ৩২ শতাংশ। আবার বাংলাদেশের ২১ শতাংশ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালের পর কার্যক্রম শুরু করেছে। ভিয়েতনামে এ হার ৪০ শতাংশ।
২০১৩ সালের পর থেকে বিনিয়োগও কমেছে, বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। এটি বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। বিদেশি বিনিয়োগও উৎপাদন ও বাজারমুখী সেবা খাতের বদলে ইউটিলিটি খাতে বেশি গেছে। উৎপাদন ও বাজারমুখী সেবায় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি ও দক্ষতার সুবিধা পেতে পারত।
উৎপাদনশীলতায় শীর্ষ ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবেদনে ‘ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান অন্য আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় গড়ে ১১ গুণ বেশি উৎপাদনশীল।
২০২২ সালে আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রয় আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এসেছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। ২০১৩ সালে তাদের অংশ ছিল ৪১ শতাংশ।
রপ্তানিও আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ১০ বছর আগে দেশের মোট রপ্তানি আয়ে ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ ছিল ৩৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৬৯ শতাংশ হয়েছে।
একই সময়ে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানিতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের অনুপাত কমেছে। রপ্তানি আয় আরও অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রয় আয়ের তিন-চতুর্থাংশ তৈরি করে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে তাদের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
বেশির ভাগ কর্মসংস্থান হয়েছে নন-ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে রয়েছে দেশের বাজারনির্ভর সেবা প্রতিষ্ঠান এবং নতুন ও ছোট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ ও রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তুলনামূলক কম।
তৈরি পোশাক খাতেও একই বৈপরীত্য রয়েছে। এ খাতের ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো মোট বিক্রয় আয়ের প্রায় অর্ধেক তৈরি করে। অথচ আনুষ্ঠানিক বেসরকারি খাতের প্রতি ১২টি চাকরির মাত্র ১টি এসব প্রতিষ্ঠানে।
বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য হলো, শুধু বড় ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি দিয়ে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও সম্ভাবনাময় অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় সরকারি নিয়মকানুন মানতে ও বিভিন্ন দপ্তরের চাহিদা পূরণে ব্যয় হয়। প্রতিবেদনের হিসাবে, আঞ্চলিক তুলনায় এটি সর্বোচ্চ।
অঞ্চলভেদে এই চাপ আরও বেশি। চট্টগ্রামে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বরিশালে ৬০ শতাংশ সময় সরকারি বিধিবিধান সামলাতে ব্যয় হয়।
নন-ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি সময় দিতে হয়। তাদের বেশি কর পরিদর্শনের মুখেও পড়তে হয়। প্রতিবেদনের মতে, শুধু নিয়ম মানার পার্থক্য দিয়ে এই ব্যবধান ব্যাখ্যা করা যায় না। এতে প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন আচরণেরও প্রতিফলন রয়েছে।
বাংলাদেশে একটি পরিচালন লাইসেন্স পেতে গড়ে ২৮ দিন লাগে। নির্মাণসংক্রান্ত অনুমতি ও আমদানি লাইসেন্স পেতে গড়ে ৪৯ দিন করে লাগে। চীন বা ভারতে একই ধরনের অনুমোদনে যে সময় লাগে, বাংলাদেশে লাগে তার প্রায় দ্বিগুণ।
একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু করতে আনুমানিক ১০ হাজার ডলার ব্যয় হয়। ছয় বছরের কম বয়সী অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ব্যয় তাদের বার্ষিক বিক্রয় আয়ের ১০ শতাংশের বেশি।
নিয়ন্ত্রণের এই বোঝা বিনিয়োগেও প্রভাব ফেলে। সরকারি নিয়মকানুন সামলাতে তুলনামূলক বেশি সময় ব্যয় করা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ কম।
বিশ্বব্যাংকের বিজনেস রেডি বা বি-রেডি মূল্যায়নে তিনটি বিষয়ে বাংলাদেশের স্কোর নিচু। এগুলো হলো বাজারে প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দেউলিয়াত্ব ব্যবস্থাপনা।
প্রতিযোগিতার নিয়ম ঠিকমতো প্রয়োগ না হওয়ায় কম উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের বাজারে টিকে থাকা সহজ হয়। অন্যদিকে নতুন ও বেশি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের বাজারে প্রবেশ এবং বড় হওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসা করে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত দাম, সুরক্ষামূলক শুল্ক ও বিশেষ সুবিধার কারণে উৎপাদনশীলতা কম হলেও তারা বাড়তি সুবিধা পায়।
বাণিজ্যিক আদালতের প্রক্রিয়া ধীর ও অনিশ্চিত। সমস্যায় পড়া প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করা বা সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করার ব্যবস্থাও দুর্বল। এতে কম উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে মূলধন স্থানান্তর বাধাগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে সাধারণ করপোরেট আয়করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র উৎপাদনকারীরা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে কর দেওয়ার সুবিধা পায়।
প্রতিবেদনের হিসাবে, করপোরেট করছাড়ের কারণে শুধু ২০২১ সালে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছিল জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ। সে তুলনায় এই ক্ষতিকে উল্লেখযোগ্য বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সুবিধার বড় অংশও প্রতিষ্ঠানের একটি ছোট গোষ্ঠী পায়। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফের আকার ২০২০–২১ অর্থবছরে ৯ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এই তহবিল থেকে রপ্তানিকারকেরা সর্বনিম্ন ২ শতাংশ সুদে ঋণ পেয়েছে। অন্য উৎপাদনকারীদের ক্ষেত্রে সুদের হার ছিল সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ।
ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের ৪২ শতাংশের ব্যাংকঋণ বা ঋণসীমা রয়েছে। নন-ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থায় কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ রয়েছে। এই সুবিধার ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত।
দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানগুলো চূড়ান্ত পণ্য আমদানিতে গড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
এ ধরনের সুরক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চেয়ে দেশের বাজারের জন্য উৎপাদন বেশি লাভজনক হতে পারে। এতে রপ্তানিতে যাওয়ার আগ্রহ কমে। বিশ্বব্যাংক একে কাঠামোগত ‘রপ্তানিবিরোধী পক্ষপাত’ বলেছে।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে আরও ১০টি রপ্তানি খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণালংকার রপ্তানির জন্যও আলাদা বন্ড বিধিমালা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত। আরও ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ঋণসুবিধাবঞ্চিত।
যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণ রয়েছে, তাদের শ্রম উৎপাদনশীলতা অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। সুতরাং প্রযুক্তি গ্রহণ, দক্ষতায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা বড় করতে অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত জামানত থাকে না। তাদের ঋণযোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থাও দুর্বল। সমস্যাগ্রস্ত ব্যবসার পুনর্গঠন বা দেউলিয়াত্ব নিষ্পত্তির কাঠামোও দুর্বল। ফলে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মূলধন পায় না।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও সহায়তার দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের সংস্থা।
এসব সংস্থার দায়িত্বে মিল রয়েছে; কিন্তু কার্যকর সমন্বয় নেই। বিনিয়োগকারীর নিবন্ধন, প্রণোদনা, জমি, লাইসেন্স ও বিনিয়োগ-পরবর্তী সহায়তার পুরো ফলাফলের জন্য কোনো একটি প্রতিষ্ঠান দায়বদ্ধ নয়।
ফলে একই ধরনের একাধিক অনুমোদন নিতে হয়। নীতি ও প্রণোদনার প্রয়োগেও ভিন্নতা দেখা যায়। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের রপ্তানিমুখী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ার সুবিধা পায়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো এই সুবিধা পায়। সাধারণ প্রতিষ্ঠানকে আরও খণ্ডিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এর মধ্যে অবশ্য সরকার বিনিয়োগসেবার কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন করা হয়েছে। তবে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, বেপজা, বিসিকসহ কয়েকটি সংস্থা এখনো আলাদা। ফলে একক নেতৃত্ব তৈরি হলেও বিনিয়োগসংক্রান্ত সব সেবা এখনো এক প্রতিষ্ঠানের অধীনে আসেনি। ওয়ান-স্টপ সেবাও বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের ব্যবসার সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা বাধা হিসেবে অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
দেশের প্রায় ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে। একটি প্রতিষ্ঠানকে মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ-বিভ্রাট সামলাতে হয়। বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে বার্ষিক বিক্রির গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়।
বিদ্যুৎ-সংযোগ পেতে গড়ে ৮৯ দিন লাগে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানকে মাঝেমধ্যে গ্রিডের বদলে নিজস্ব জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও অনির্ভরযোগ্য। এতে অঞ্চলভেদে ব্যবসার সুযোগের বৈষম্য বাড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বছরে প্রায় ৭ শতাংশ করে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের সব অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান কম উৎপাদনশীল নয়। প্রায় ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ছোট আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সমান উৎপাদনশীলতায় কাজ করছে।
উচ্চ উৎপাদনশীল অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৫ বছরের কম। প্রায় ৮০ শতাংশ খুচরা ব্যবসা ও সেবা খাতে রয়েছে। আর প্রায় ৮৫ শতাংশ ঢাকা মহানগর এলাকায় অবস্থিত।
এসব প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক বাজার, ব্যাংকঋণ, সরবরাহকারী উন্নয়ন কর্মসূচি বা সরকারি সহায়তা পায় না। তারপরও বড় বাজার ও পরিবহন নেটওয়ার্কের কাছাকাছি থাকায় তারা তুলনামূলক ভালো করছে।
অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক না হওয়ার প্রধান কারণ নিবন্ধনের ব্যয় ও সময়। প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এটিকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আনুষ্ঠানিক হলে সম্ভাব্য করের বোঝাকে বাধা বলেছে ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শন বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি উল্লেখ করেছে ৬১ শতাংশ। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবকে বাধা বলেছে ৩৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।
তবে আনুষ্ঠানিক হওয়ার সুবিধা সম্পর্কেও প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতন। নিবন্ধিত হলে ঋণ ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করে ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। নতুন গ্রাহক পাওয়া যাবে বলে মনে করে ৪৯ শতাংশ।
সমস্যা হলো, এসব সুবিধা তাৎক্ষণিক বা নিশ্চিত নয়। কিন্তু নিবন্ধন, কর ও পরিদর্শনের ব্যয় শুরু থেকেই বহন করতে হয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে অনানুষ্ঠানিক থাকা একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
বিশ্বব্যাংক ‘স্মার্ট ডিরেগুলেশন’ বা বুদ্ধিদীপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণ সহজ করার কথা বলেছে। এর অর্থ সব নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া নয়। কম ঝুঁকির ব্যবসায় অনুমোদন ও নিয়ম মানার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। বেশি ঝুঁকির কার্যক্রমে তদারকি শক্তিশালী করতে হবে।
স্বল্প মেয়াদে এক দরজায় সেবা বা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সারা দেশে সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু অনলাইনে আবেদন নিলে হবে না। লাইসেন্স দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল করতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, পরিদর্শন ও নিয়ম মানার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি করছাড়ের মতো প্রণোদনা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিক হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ঋণদাতার ঝুঁকি কমিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠান ও খাতে নিয়মের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতার সমান পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বাণিজ্যনীতি সংস্কারে জাতীয় শুল্কনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অংশ হিসেবে শুল্ক ও শুল্কের মতো অন্যান্য বাধা পর্যায়ক্রমে কমানোর কথা বলা হয়েছে। সীমান্ত বাণিজ্যকে ডিজিটাল ও কাগজবিহীন করতে হবে।
রাষ্ট্রের দেওয়া করছাড়, কম সুদের ঋণ ও অন্যান্য সুবিধার একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। কোন প্রতিষ্ঠান কী কারণে সুবিধা পাবে, তার বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড থাকতে হবে। সুবিধাভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ করতে হবে।
সুবিধা দেওয়ার আগে ও পরে এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। প্রতিটি সহায়তার নির্দিষ্ট মেয়াদ রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় সুবিধা স্থায়ী অধিকারে পরিণত হবে না। বরং উৎপাদনশীলতা ও বহুমুখীকরণের ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
মধ্য মেয়াদে ব্যবসার ঝুঁকি অনুযায়ী আলাদা লাইসেন্স ও পরিদর্শনব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। কম ঝুঁকির কার্যক্রমকে কিছু অনুমোদন থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। আর বেশি ঝুঁকির ব্যবসায় তদারকি বাড়ানো যেতে পারে।
বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সারা দেশে বাণিজ্যিক আদালত সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।
বিনিয়োগসেবা দেওয়া বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব সমন্বয় করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে বড় দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পণ্যের মান ও বড় ক্রেতাদের শর্ত পূরণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে হবে। উচ্চ উৎপাদনশীল অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। তাদের ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতে আসার সুযোগও দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ছড়িয়ে থাকা সহায়তা কর্মসূচিগুলোও সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, সুরক্ষা ও বিবেচনানির্ভর সুবিধার বদলে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও উৎপাদনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি ও ভালো কর্মসংস্থানে রূপ নিতে পারে।