ফ্যামিলি কার্ডে ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা

নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড দিতে পাঁচ বছরে সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ কার্ডে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবে প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবার। প্রতিবছর উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়াবে সরকার। বাড়বে তাঁদের জন্য বাজেট বরাদ্দও। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মার্চ নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে গতকাল সোমবার ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাবিষয়ক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, সমাজকল্যাণসচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ফ্যামিলি কার্ড

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড বর্তমান সরকারের শুধু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নয়, বরং মানবিক ও দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় টাকা বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হবে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে ইতিমধ্যে ৩৭ হাজারের বেশি কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কোথাও কেউ বাদ পড়েছে কি না, আবার কেউ ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা চাই ভবিষ্যতে প্রকল্পটি আরও নির্ভুলভাবে পরিচালিত হোক।’

চলতি অর্থবছর অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত ৮৬ হাজার জনকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য ৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন হবে বলে অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ টাকার ৬৬ শতাংশ ব্যয় হবে সরাসরি নগদ সহায়তা দিতে। আর বাকি ৩৪ শতাংশ ব্যয় হবে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন পদ্ধতি চালু, কার্ড ইত্যাদি কাজে। ৩৭ হাজার জনকে ইতিমধ্যে কার্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪৮ হাজার জনকে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

বৈঠকের পর যোগাযোগ করলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ জন্য অর্থের কোনো ঘাটতি হবে না। তবে প্রকল্পের শুরুর দিক এখনো। অনেক কাজ বাকি। চলমান কিছু কর্মসূচি আছে, যেগুলো সমন্বয় করার দরকার পড়তে পারে।’

বৈঠকে সমাজকল্যাণসচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৯-৩০-এ চার অর্থবছরের ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী ও তাঁদের জন্য ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন। বছরওয়ারি উপকারভোগী বৃদ্ধি ও তাঁদের জন্য ব্যয় বৃদ্ধির প্রাক্কলনও দেখান তিনি।

বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ উপকারভোগীর জন্য ১৩ হাজার ৭৪০ কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৮১ লাখ উপকারভোগীর জন্য ২৬ হাজার ৭৩০ কোটি, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ উপকারভোগীর জন্য ৩৯ হাজার ৯৩০ কোটি এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১ কোটি ৬১ লাখ উপকারভোগীর জন্য ৫৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ লাগবে।

অর্থাৎ, চলতি অর্থবছরসহ মোট পাঁচ বছরের জন্য ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয় হবে জরিপ ও অন্যান্য কাজে। নগদ সহায়তার জন্য থাকবে ১ লাখ ২১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পরিবারপ্রতি সরকারের ব্যয় হবে বছরে ৩০ হাজার টাকা। ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের মধ্যে জরিপ চালিয়ে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। বছরে কমপক্ষে এক কোটি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে সরকার।

সূত্রগুলো জানায়, ফ্যামিলি কার্ডধারীদের নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ভুলত্রুটি বের করার কাজ করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সমাজকল‍্যাণ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ করার জন্য তদারক কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কাজটি ভালোভাবে করার জন্য সমাজকল‍্যাণ মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তরে লোকবল বৃদ্ধি, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন অফিসের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান সরকারের অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগের একটি হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি বাস্তবায়নের অর্থ কোথা থেকে আসবে? ঋণ করে তো আর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাবে না। দরকার হচ্ছে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি। আবার যেসব বিদ্যমান কর্মসূচিতে অপচয় হচ্ছে, সে ব্যাপারে নজর দিলে অর্থ বাঁচবে।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনেও সরকারকে যত্নশীল থাকতে হবে। আশা করছি, এ কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে সরকার অর্থের ঘাটতিতে পড়বে না।’