
সারা দেশে কাজের সুযোগ পাবে ৬৮৩ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান।
সিইও নিয়োগ ও অপসারণে এমআরএর অনাপত্তি থাকা বাধ্যতামূলক।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) দেওয়া সনদ থাকলেও দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এত দিন সারা দেশে কাজ করতে পারছিল না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকেই নির্দিষ্ট আঞ্চলিক সীমার মধ্যে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছিল। এক জেলার অনুমতি থাকলে পাশের জেলায় কাজ করার এখতিয়ার ছিল না। এ সীমাবদ্ধতা আর থাকছে না।
বিদ্যমান এমআরএ বিধিমালা, ২০১০ সংশোধন করে এ–সংক্রান্ত ধারাটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে এমআরএ। এর ফলে যেকোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান দেশের যেকোনো অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবে। শুধু আঞ্চলিক সীমা নয়, সনদের শর্ত ভঙ্গসহ বিদ্যমান বিধিমালার মোট ৩১টি বিধি ও উপবিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এমআরএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৮৩। এর বেশির ভাগই আঞ্চলিক পর্যায়ে কাজ করে। এর মধ্যে অনেকগুলো জাতীয় পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ চেয়ে এমআরএর কাছে আবেদন করে রেখেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া সদস্যের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২৩ লাখ, যার প্রায় ৯১ শতাংশ নারী।
এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সম্প্রতি এসব তথ্য জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, এমআরএ, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গত আগস্টে অনুষ্ঠিত দুই দফা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আলোচনায় উঠে আসা মতামতের ভিত্তিতে একটি সংশোধিত খসড়া বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। খসড়াটি এরই মধ্যে এমআরএর পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন পেয়েছে।
খসড়া বিধিমালা নিয়ে কাজ চলছে। এটি শিগগিরই আইনি পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সংশোধিত বিধিমালা জারি করা হবেনাজমা মোবারেক, সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, খসড়া বিধিমালা নিয়ে কাজ চলছে। এটি শিগগিরই আইনি পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সংশোধিত বিধিমালা জারি করা হবে।
সংশোধিত বিধিমালায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা পরিবর্তনসংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এত দিন এমআরএকে জানালেই প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা পরিবর্তন করা যেত। সংশোধনী প্রস্তাবে এমআরএর পূর্বানুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বিদ্যমান বিধিমালায় সনদ বাতিলের জন্য পাঁচটি কারণ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সনদে উল্লিখিত শর্তসমূহ ভঙ্গ করলে’ সনদ বাতিল করা যাবে। সংশোধনী প্রস্তাবে এটি পরিবর্তন করে বলা হয়েছে, ‘সনদের যেকোনো শর্ত ভঙ্গ করলে’ সনদ বাতিল করা যাবে। এমআরএর যুক্তি হলো, বর্তমান বিধান থেকে মনে হয় সনদ বাতিলের জন্য সব শর্ত ভঙ্গের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা গ্রাহকস্বার্থ ও বাস্তবতার নিরিখে গ্রহণযোগ্য নয়।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের তৈরি বাজেট সাধারণ পর্ষদের বার্ষিক সভায় (এজিএম) অনুমোদিত হয়। বার্ষিক নিরীক্ষার জন্য বহির্নিরীক্ষকও নিয়োগ দেয় সাধারণ পর্ষদ। বর্তমান বিধানের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করা হচ্ছে—প্রয়োজনে এমআরএ নিজেই বহির্নিরীক্ষক বা নিরীক্ষা ফার্ম নিয়োগ দিতে পারবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ পর্ষদের মাধ্যমে বহির্নিরীক্ষক নিয়োগের বিধান প্রযোজ্য হবে না। গ্রাহকস্বার্থসহ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনায় রেখে এ সংশোধনী আনা হচ্ছে।
বিদ্যমান বিধিমালায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি একাদিক্রমে তিন মেয়াদের বেশি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকতে পারবেন না। তবে শর্ত রয়েছে, প্রতি মেয়াদে এমনভাবে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে পর্ষদের সদস্যসংখ্যা অর্ধেকের কম না হয়। সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো মেয়াদে বিদ্যমান মোট সদস্যসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশের বেশি পরিবর্তন করা যাবে না। অনিবার্য ক্ষেত্রে এমআরএর অনুমোদন নিয়ে এর ব্যতিক্রম করা যাবে। এমআরএর মতে, পুরোনো সদস্যদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন ও পুরোনোদের সমন্বয় সাধন এবং সনদ হস্তান্তর রোধ করাই এর লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সংশোধিত বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এখন এটি কত দ্রুত জারি হয়, সে অপেক্ষায় রয়েছে এমআরএমোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান, এমআরএ
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তহবিলসংক্রান্ত বিধিতে সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে সাধারণ পর্ষদের সদস্যদের কাছ থেকে অনুদান নেওয়ার কথা বলা আছে। সংশোধনীতে অনুদানের পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘গ্রাহক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে নেওয়া ঋণ’–সংক্রান্ত উপবিধিটি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানতে চাইলে এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সংশোধিত বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এখন এটি কত দ্রুত জারি হয়, সে অপেক্ষায় রয়েছে এমআরএ।
বিধিমালায় যেসব নতুন সংযোজন
নতুন গ্রাহক ও আমানতকারীদের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ রোধে এমআরএ চাইলে যেকোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে এমআরএর স্থায়ী পদে কর্মরত কাউকে এক বছরের জন্য পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে, এমন একটি নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনে জটিলতা নিরসন ও অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্যেই এ ধারা সংযোজন করা হচ্ছে।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগসংক্রান্ত বিধিতেও পরিবর্তন আসছে। বিদ্যমান চারটি বিধির সঙ্গে তিনটি নতুন উপবিধি যুক্ত হবে। এমআরএর অনাপত্তি ছাড়া সিইও নিয়োগ করা যাবে না। সিইওর যোগ্যতা ও অন্যান্য বিষয় সময়–সময় নির্ধারণ করবে এমআরএ। সিইও অপসারণ বা অব্যাহতির আগেও এমআরএর অনাপত্তি নিতে হবে।
এ ছাড়া শাখা কার্যালয় স্থাপন বা বন্ধ করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ দিন আগে এমআরএকে জানাতে হবে, এমন একটি উপবিধি যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবৈধ শাখা খোলা, গ্রাহক প্রতারণা ও সনদ হস্তান্তর রোধে এ বিধান যুক্ত করা হচ্ছে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছে এমআরএ।
আশা ইন্টারন্যাশনালের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সনদ নেওয়ার পর সারা দেশে কাজ করার সুযোগ তৈরির উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান। তবে তাঁর মতে, সনদের শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বাতিলের আগে সংশোধনের সুযোগ থাকা উচিত।