ওয়েবিনারে অভিমত

দেশের আর্থিক খাতে রাজনীতি ঢুকে গেছে

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক দুটি ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থার ঋণমান কমিয়ে দেওয়ার প্রভাব নিয়ে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়।

ওয়েবিনারে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘যেকোনো দেশের আর্থিক খাতের নীতি পেশাগতভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে আর্থিক খাতে রাজনীতি ঢুকে গেছে। নতুন ব্যাংক তৈরি ও ঋণ প্রদান থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হয়। এটা আমাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।’

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমানে সাম্প্রতিক পরিবর্তন ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। ওয়েবিনারটি আয়োজন করে ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (সিআরআইএসএল)।

অনুষ্ঠানে পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা অংশীদার মামুন রশীদ বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করে ফেলেছে, যেটা ২০০৭–০৮ সালের ক্রান্তিলগ্নেও দেখা যায়নি। দক্ষতর আর্থিক ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে মামুন রশীদ বলেন, ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বেশ কিছু ব্যাংকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে অনেক ব্যাংকে থাকা ডলার ব্যাংকগুলোর মালিকেরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ঋণপত্র বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন বলে শুনতে পাই।’

রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করে ফেলেছে। যেটা ২০০৭–০৮ সালের ক্রান্তিলগ্নেও দেখা যায়নি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বেশ কিছু ব্যাংকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
মামুন রশীদ, ব্যবস্থাপনা অংশীদার, পিডব্লিউসি

ঋণমান বাড়াতে আর্থিক খাতে সংস্কার প্রয়োজন

দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তিনটি আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থার আওতায় রয়েছে। এগুলো হচ্ছে মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ। প্রায় সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশও এসব ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থার আওতায় রয়েছে। চলতি বছর মুডি’স দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দিয়েছে। আর এসঅ্যান্ডপি ঋণমানের আভাস কমিয়েছে।

অনুষ্ঠানে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের আর্থিক খাতের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার ঋণমান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নানা বিবেচনায় এখন তারা বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দিয়েছে।

ঋণমাণ একটি দেশের আর্থিক খাত সম্পর্কে তৃতীয় দৃষ্টি হিসেবে কাজ করে উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গভর্নরসহ দেশের অনেক নীতিনির্ধারক এটি মানতে চান না। মান ভালো হলে তাঁরা বলেন, আমরা ভালো করছি। আর মান খারাপ হলে তাঁরা বলেন, এসব ঋণমানের কোনো গুরুত্ব নেই।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেনি বলে মনে করেন মামুন রশীদ। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত রিজার্ভকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়নেও আমরা বিষয়টি দেখতে পেয়েছি। এখনো রিজার্ভ পরিস্থিতি ভালো হয়নি। এ জন্য আমি বাংলাদেশ ব্যাংককে আংশিকভাবে দায়ী করব।’

সংকট কাটাতে শ্রীলঙ্কা বড় উদাহরণ

মামুন রশীদ বলেন, ‘সংকট কাটিয়ে উঠতে বর্তমানে আমাদের সামনে বড় উদাহরণ শ্রীলঙ্কা। নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে তারা বাংলাদেশের ঋণও পরিশোধ করেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি একটি ঋণমান সংস্থার প্রধান নির্বাহী (সিইও) আসাদুজ্জামান খান বলেন, পেশাদারি, সুশাসন ও মূল্যবোধের কারণে শ্রীলঙ্কা তাদের সংকট কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই সব কটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনেক সৃজনশীল মেধাবী কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু তাঁরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ভালো কিছু করতে পারছেন না।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, দেশে অনেক ঋণমান নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। দেশীয় ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থাগুলো যদি সঠিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণমাণ করতে পারত, তাহলে এত বেশি ঋণখেলাপি হতে পারত না।

বাহরাইনভিত্তিক ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল রেটিং এজেন্সির পরামর্শক ফাহিম আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণমাণ সংস্থাগুলোর ঋণমান নির্ণয়ের পদ্ধতি পরিষ্কার নয়। একটি সংস্থা ঋণমান কমালে অন্য সংস্থাও ঋণমান কমিয়ে দেয়।

সিআরআইএসএলের নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মুজাফফর আহমেদ বলেন, ‘ঋণমান এখন একটা বৈশ্বিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ঋণমান নির্ণয় করা ইতিবাচক ঘটনা। তবে এখন আমাদের ঋণমান বাড়াতে কাজ করতে হবে।’