পণ্যবাহী ছোট জাহাজ
পণ্যবাহী ছোট জাহাজ

বিআইডব্লিউটিএর সিদ্ধান্ত

নৌপথের ভাড়া বৃদ্ধি, বাড়ছে শিল্পের খরচ

দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নৌপথেই তাদের বেশির ভাগ পণ্য ও কাঁচামাল আনা-নেওয়া করে থাকে। কারণ, নৌপথকেই সবচেয়ে সাশ্রয়ী মনে করা হয়। কিন্তু নৌপথে বিভিন্ন সেবার শুল্ক সম্প্রতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ফলে বিভিন্ন শিল্প ও সেবা খাতের পরিচালন ব্যয় ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাঁরা এমনিতেই চাপে আছেন। এর সঙ্গে নৌপথের এ বাড়তি খরচ তাঁদের ওপর খরচের নতুন চাপ তৈরি করবে। বাড়তি ব্যয়ের কারণে একদিকে পণ্যের দাম বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যেতে পারে। এতে তাঁরা উভয়সংকটে পড়বেন। তাঁরা শুল্ক বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

গত ১১ মে নৌপথে বিভিন্ন সেবার শুল্ক ও ফি বাড়িয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এতে জাহাজ পরিবহন, টার্মিনাল ও জেটি ফি এবং পণ্য খালাসসহ প্রায় অর্ধশত সেবার ফি, ভাড়া ও টোল পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামীকাল ১ জুলাই থেকে বর্ধিত এসব মাশুল কার্যকর হওয়ার কথা। এর আগে সর্বশেষ ২০১৯ সালে শুল্ক বাড়িয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ।

নৌপথে পণ্য পরিবহন করে এমন বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০১৯ সালের তুলনায় এ বছর প্রতিটি খাতের ফি অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। এ ধরনের বড় সিদ্ধান্তের আগে লঞ্চ মালিক সমিতি, কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ ব্যবসায়ী সংগঠন ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা বা যৌথ বৈঠক করা হয়নি। কোনো পক্ষকে না জানিয়ে বিআইডব্লিউটিএ একতরফাভাবে শুল্ক বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বি এম আতাউর রহমান বলেন, ‘নতুন প্রজ্ঞাপনে কনজারভেন্সি চার্জ (রক্ষণাবেক্ষণ) কয়েক ধরনের ফি অনেক বেশি বেড়েছে। ফি বাড়ানোর আগে আমাদের সঙ্গে সেভাবে কথা বলা হয়নি। আমরা ইতিমধ্যে এ ব্যয় বৃদ্ধি পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছি।’

কোন সেবায় কেমন ব্যয় বেড়েছে

প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাড়া, টোল ও ফি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ বা তার বেশি বেড়েছে। যেমন নৌপথগুলোকে চলাচলের উপযোগী রাখা, ড্রেজিং (নদী খনন) এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে নৌপথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ফি (কনজারভেন্সি চার্জ) নেয় বিআইডব্লিউটিএ। এত দিন দেশি কার্গো, বাল্কহেড বা বার্জের মতো মালামাল পরিবহনের বিভিন্ন যান থেকে প্রতি টনে ৪০ থেকে ৫০ টাকা ফি নেওয়া হতো। এখন তা বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে, অর্থাৎ ফি বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ।

এভাবে জ্বালানি তেল পরিবহনকারী নৌযান বা ট্যাংকারের ফি প্রতি টনে ছিল ১৪৪ টাকা, যা বাড়িয়ে এখন ২৮০ টাকা করা হয়েছে। নদীপথের ঝুঁকিপূর্ণ বা জটিল এলাকায় জাহাজকে নিরাপদে ঘোরানো বা এগিয়ে নিতে দক্ষ ‘পাইলট’ বা নৌপথপ্রদর্শক ব্যবহার করতে হয়। এই পাইলটেজ ফি এত দিন প্রতি বিটে (নির্দিষ্ট দূরত্ব) প্রতিবারের জন্য ৫০০ টাকা ছিল, যা বাড়িয়ে এখন ৭৭৫ টাকা করা হয়েছে। মোংলা-ঘোষিয়াখালী বা গাবখান চ্যানেল ব্যবহারের টোল প্রতি টনে ৮ থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্রেন ব্যতীত জেটিতে সাধারণ মালামাল নামানোর লেবার বা কুলি চার্জ প্রতি টনে ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা এবং বাল্ক কার্গোতে বস্তাভর্তি ও সেলাইকরণের চার্জ ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে। এভাবে অন্যান্য প্রায় সব ধরনের ফি কমবেশি বেড়েছে।

বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স সমিতির সাবেক সহসভাপতি ও পূর্বাঞ্চল কার্গো জাহাজ মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হোসাইন জানান, গত তিন বছরে লোহা ও জ্বালানির দাম, মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণসহ জাহাজ পরিচালনার সার্বিক ব্যয় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। সর্বশেষ সরকার যেসব খাতে ফি বাড়িয়েছে তাতে আরও ১০ শতাংশ ব্যয় বাড়বে। কিন্তু এই ২৫ শতাংশ ভাড়া একসঙ্গে বাড়ানো যাবে না। আবার ভাড়া না বাড়ালে লোকসানে পড়তে হবে।

সিমেন্ট কোম্পানির খরচ বাড়বে ৭০%

নৌপথের এই শুল্ক বৃদ্ধির কারণে যেসব খাতে বড় প্রভাব পড়তে পারে, তার একটি হলো সিমেন্টশিল্প। কারণ, সিমেন্ট উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল (ক্লিংকার, লাইমস্টোন, ফ্লাই অ্যাশ প্রভৃতি) সমুদ্রপথে আমদানির পর তা নদীপথে কারখানায় নেওয়া হয়। আবার উৎপাদিত সিমেন্টও প্রধানত নৌপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। এ কাজে তারা এখন বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়বে। যেমন জেটি দিয়ে মালামাল ওঠানামার ফি প্রতি টনে ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ নির্মিত অস্থায়ী আরসিসি জেটির মাসিক ভাড়া প্রতি বর্গমিটারে ২৩ থেকে বাড়িয়ে ৫২ টাকা হয়েছে। আবার কোম্পানির নিজস্ব জেটির জন্য আগে প্রতি বর্গমিটারে ২০ টাকা ছিল, যা বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে। জেটি–সংলগ্ন ঘর বা ছাউনির ভাড়া ১৩ টাকা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি শতাংশ তীরভূমি ব্যবহারের ফি ২৮৯ থেকে বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) জানিয়েছে, নতুন নিয়মে প্রতিটি সিমেন্ট কোম্পানিকে আগের চেয়ে ৭০ শতাংশের বেশি ফি পরিশোধ করতে হবে। দেশে সিমেন্টের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনসক্ষমতা প্রায় তিন গুণ হওয়ায় বাজার ধরে রাখার লড়াইয়ে পণ্যের দাম সমন্বয় করা কোম্পানিগুলোর জন্য কঠিন হবে। এটি মুনাফা কমিয়ে দেবে।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সহসভাপতি ও লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইকবাল চৌধুরী বলেন, নির্মাণ খাত, বিশেষ করে সিমেন্টশিল্প এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। দেশে চলমান মূল্যস্ফীতির কারণে সিমেন্টের চাহিদা সেভাবে বাড়ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানির বাড়তি দাম। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটে কাঁচামালের দামও বেড়েছে। এমন অবস্থায় নৌপথে পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে সামগ্রিক সরবরাহশৃঙ্খলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগের রেটটি অনেক পুরোনো ছিল। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ফি বাড়িয়ে একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরপর মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি সেই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন রেট নির্ধারণ করেছে।

নৌপরিবহনসচিব আরও বলেন, নতুন নির্ধারিত রেট নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি থাকলে এবং তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানালে তা পর্যালোচনা করে দেখা হতে পারে।