মূল্যস্ফীতি
মূল্যস্ফীতি

জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পর ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি কত হয়েছিল, এবার শঙ্কা কতটা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই খরচ বাড়ে। দৈনন্দিন জীবন আরও খরুচে হয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পায়। এটিই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব।

গতকাল আবারও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হলো। অকটেন ও পেট্রলের দাম প্রথমবারের মতো ১৫০ টাকা ছাড়াল। অকটেন, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিনের হঠাৎ এত মূল্যবৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষেরা। ২০২২ সালের আগস্ট মাসের পর জ্বালানি তেলের দাম একলাফে এত বাড়ানো হয়নি।

এবার দেখা যাক, ২০২২ সালে আগ মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কী প্রভাব পড়েছিল মানুষের জীবনে। মূল্যস্ফীতি কত হয়েছিল, এর প্রভাব কী ছিল।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের ৬ আগস্ট ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। ৭ আগস্ট থেকে নতুন দাম কার্যকর করা হয়। মাস শেষে দেখা গেল, সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তখন মানুষের জীবনের পদে পদে খরচ বেড়েছে।

তখন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা এবং কেরোসিনের দাম একই হারে বাড়ানো হয়। পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ৮৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেনের দাম ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছিল। অকটেন ও পেট্রলের দাম প্রথমবারের মতো ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

তখন এ মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। যাতায়াত খরচের পাশাপাশি জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিতে সীমিত আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভোগান্তি বাড়ে।

গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ যেন বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে পারে, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি এই মুহূর্তে সরকারের নেই। তাই বিদ্যমান কর্মসূচির সুবিধা যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে—জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়।

মূল্যস্ফীতি কত হয়েছিল, পরে কী হলো

২০২২ সালের আগস্ট মাসের আগের প্রায় এক দশক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে ছিল। ২০২২ সালের জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। কিন্তু আগস্ট মাসের জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতিও এক মাসের ব্যবধানে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। তখন পণ্য ও যাত্রী পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। এসব কিছুই মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়েছিল।

সেই ২০২২ সালের আগস্ট মাসের পরের ৪ বছরে মূল্যস্ফীতি আর কখনো সাড়ে ৭ শতাংশে নামেনি। এরপরে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে একাধিক দফায়। আবার ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের কারণে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়। আমদানিতে জাহাজভাড়া বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। দেশের বাজারেও ডলার–সংকট ছিল। এসব কারণে মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের আগস্ট মাসের পর পুরোনো জায়গায় ফিরে আসেনি। উল্টো বেড়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি হয় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর এত মূল্যস্ফীতি হয়নি। ২০২৪ সালে জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের আমলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে আছে।

এবার কী হতে পারে

অকটেন, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিনের আবার মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দেশের গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষেরা। মূলত জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি ধাপেই খরচ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। এতে যাতায়াত খরচ বাড়বে। অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়।

মূল্যস্ফীতির চাপ আগের চেয়ে বাড়বে, এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মানুষের আয় না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি অনুভব করেন তাঁরা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বেশি কষ্ট হবে।

আবার মানুষের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতা বেড়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে তাঁরা নতুন বেতন পেতে শুরু করবেন। তখন বাজারে আরেক দফা প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার কমালে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে পারে। তখন আবার বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হতে পারে।

অর্থনীতিবিদের মূল্যায়ন

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিত, প্রভাব ও করণীয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে, তাই দেশে দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। ইরান যুদ্ধের আগে যে দাম ছিল, এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তার চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। দাম কম রাখলে সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হবে। সরকারের আর্থিক সংগতি সেই অবস্থায় নেই। তবে মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের যে নীতি আছে, তা মানা হয়নি। হঠাৎ করে মাসের ২০ তারিখের পর দাম বাড়ানো হয়েছে।

জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। তবে এই অজুহাতে যেন অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা তৈরি না হয়। এখন মুদ্রানীতিতে কিছুটা ছাড় দেওয়ার মনোভাবের মধ্যে আছে সরকার। মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে অন্যান্য দেশের মতো কঠোর অবস্থানে যাওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

জাহিদ হোসেনের মতে, গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ যেন বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে পারে, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি এই মুহূর্তে সরকারের নেই। তাই বিদ্যমান কর্মসূচির সুবিধা যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।