গবেষণা সংস্থা ভয়েস ফর রিফর্ম ও পলিসি এক্সচেঞ্জ আয়োজিত ‘ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় অতিথিরা। আজ রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে
গবেষণা সংস্থা ভয়েস ফর রিফর্ম ও পলিসি এক্সচেঞ্জ আয়োজিত ‘ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় অতিথিরা। আজ রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে

আলোচনা সভায় অভিমত

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষক ও বিভিন্ন খাতের বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে জ্বালানিসংকট ও মূল্যবৃদ্ধি সরকারের ঋণ ও ভর্তুকির বোঝা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, দেশের ৬৩ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভর। তাই দীর্ঘ মেয়াদে এই যুদ্ধ দেশের পরিবহন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কৃচ্ছ্রতা সাধনের দিকে যেতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে লোডশেডিংয়ের পরামর্শও দেন তাঁরা।

আজ রোববার ‘ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আজ সকালে যৌথভাবে এই আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গবেষণা সংস্থা ভয়েস ফর রিফর্ম ও পলিসি এক্সচেঞ্জ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। মূল আলোচক ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।

সভায় এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘গত ২০ বছর দেশে গ্যাসকূপ খনন না করে দেশকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নির্ভর করে তোলা হয়েছে। এখন ভুলপথে থাকা জ্বালানি নীতিও ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আমাদের ৬৩ শতাংশ ডিজেল ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে। গালফ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ৮০ শতাংশ ক্রুড ওয়েল আমদানি করা হয়। এখন কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। তাতে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেছে ৬৩ শতাংশ। তাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে দেশের রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়।’

পণ্য জাহাজীকরণের ভাড়া বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। এতে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গেলে প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট দাম বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যেতে পারে।
—মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ

রপ্তানি খাতের ওপর এই সংকটের প্রভাব নিয়ে এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ইতিমধ্যে পণ্য জাহাজীকরণের ভাড়া বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। এতে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গেলে প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট দাম বেড়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির আদেশ অন্য দেশে চলে যেতে পারে। আবার প্রবাসী আয় কমলে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে। বাড়তি জ্বালানি ভর্তুকি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। এই অবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই।

সভায় জ্বালানিবিষয়ক গবেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘বছরে আমাদের ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হয়। জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর হওয়ায় দাম কিছুটা বাড়লেই বড় চাপ তৈরি হয়। এখন আমাদের ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ তেল থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। তাই তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৬০ পয়সা বেড়ে যায়। তাই সরকার এক বছরে ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে।’

প্রয়োজনে লোডশেডিং

সভায় এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন বলেন, দেশে জ্বালানি দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এ খাতে সরকারে কাঁধে ইতিমধ্যে ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলারের দায় রয়েছে। তাই প্রয়োজনে অনুৎপাদনশীল খাতে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং করতে পারে সরকার।

জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর হওয়ায় দাম কিছুটা বাড়লেই বড় চাপ তৈরি হয়। এখন ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ তেল থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। তাই তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৬০ পয়সা বেড়ে যায়।
—শফিকুল আলম, জ্বালানিবিষয়ক গবেষক

ভয়েস ফর রিফর্মের সদস্য সৈয়দ হাসিব উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ১০০ টাকা আয়ের ২৯ টাকা সুদ পরিশোধে আর ২১ টাকা চলে যাচ্ছে ভর্তুকি ব্যয়ে। নতুন সরকার বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে গেলে সরকারের ঋণ ও ভর্তুকি ব্যয় আরও বাড়বে। তাই সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবাই মিলে আমরা কৃচ্ছ্রতা সাধনে রাজি আছি।’

এ প্রসঙ্গে ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, কৃচ্ছ্রতা সাধনে জাতীয় ঐক্যমত্য দরকার। কোনো কারণে বিদ্যমান ঐক্যমত্য যেন সংকটে না পড়ে, সরকারকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রপ্তানি আদেশ স্থগিত হচ্ছে

আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতিমধ্যে রপ্তানি আদেশ স্থগিত (হল্ড) করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, ক্রেতা দেশগুলোতে খাদ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তাই সামনে রপ্তানি আদেশ আরও কমে যেতে পারে। পোশাক খাত ভালো করছিল না, এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি এই খাতকে আরও নাজুক করে তুলছে। ভারতের সঙ্গে স্থলবন্দরগুলো চালু করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী, পুঁজিবাজারের অংশীজন আসিফ খান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক সাহাব এনাম খান।