
বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প আছে। এগুলোর মধ্যে কিছু প্রকল্পে অর্থের সঠিক ব্যবহার, বিনিয়োগের বিপরীতে আয়, কর্মসংস্থান ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করা হয়নি। যেসব প্রকল্প এই চার মানদণ্ড পূরণ করবে, সেগুলো অনুমোদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের টাকা মানে দেশের মানুষের টাকা, করদাতাদের টাকা। তাই প্রতিটি প্রকল্প করার পেছনে জবাবদিহি থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের পেছনে সঠিক পরিকল্পনা ও সুফল থাকতে হবে, তা জনগণকেও জানতে হবে, শুধু আমরা জানলেই হবে না। সাধারণ মানুষকেও জানতে হবে, এসব প্রকল্পের পেছনে কী ভাবনা আছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আজ রোববার পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মিলনায়তনে ‘স্টেপিং ফরওয়ার্ড: দ্য ইনাগুরেশন অব রেইজ-২’ শীর্ষক উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক।
এ ছাড়া সম্মানিত অতিথি ছিলেন দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের আঞ্চলিক পরিচালক গেইল এইচ মার্টিন। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে বক্তব্যে দেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
সাধারণ মানুষ অর্থনীতির বাইরে থেকে গেছে
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে সবকিছু কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত হওয়া (অলিগার্কি) ও পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতির কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনীতির বাইরে থেকে গেছে। ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে, এখনো বাড়ছে। আমরা বড় প্রকল্পের (মেগা প্রজেক্টের) দিকে না গিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক কর্মসূচির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমরা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার) দিকে যাচ্ছি। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় নিজ পকেট থেকে ব্যয় আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি। এটি লজ্জাজনক ব্যাপার। আমরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন করতে চাচ্ছি। আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যাবে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের ধারণা, জিডিপি মানেই শুধু উৎপাদন। তবে সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলার মতো বিষয় ক্রিয়েটিভ ইকোনমি হিসেবে জিডিপিতে অবদান রাখতে পারে। লন্ডনের থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টে যে ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেখা যায়, তা অনেক কারখানার চেয়েও বড়। স্টেডিয়ামে মানুষ টিকিট কেটে খেলা দেখতে যায়, সেটাও অর্থনীতি। হাজার হাজার মানুষ সেখানে গিয়ে খেলা দেখে, খরচ করে, এটাও জিডিপিতে অবদান রাখে। তাই এই জায়গাগুলোতে আমাদের বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।’
রেইজ ২ প্রকল্পে যা আছে
অনুষ্ঠানের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, এই প্রকল্পের মূল তিনটি লক্ষ্য হলো—শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও ঝুঁকি হ্রাস। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমানে ১৩টি কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ১৫ হাজার লার্নিং সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে এসব উদ্যোক্তাদের প্রায় ৭৩ শতাংশই সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে দুই লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ১ হাজার ৬০০ নারীকে গৃহভিত্তিক শিশু লালন-পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণসহায়তা দেওয়া হয়েছে। দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২২ সালে এই প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে চর, হাওর, পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে
অনুষ্ঠানে পিকেএসএফের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয় অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে। জিডিপিতেও এই খাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি। অনেকের ধারণা, অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেকেই অদক্ষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকে কিছু জানেন, আবার কেউ কম জানেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যাঁরা কম জানেন, তাঁদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। আর যাঁরা জানেন না, তাঁদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের আঞ্চলিক পরিচালক গেইল এইচ মার্টিন বলেন, এই উদ্যোগের কেন্দ্রে আছে কর্মসংস্থান। দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে দ্রুত ও নিশ্চিত পথ হলো কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থানের চাহিদা আছে। তবে সম্প্রতি কয়েক বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে ৯ লাখের মতো। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি আরও বাড়ানো জরুরি।