ভোক্তা ঋণ

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রভাব ক্রেডিট কার্ডে

ক্রেডিট কার্ডে অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। অনেক গ্রাহক ন্যূনতম টাকা জমা দিয়ে কার্ডের লেনদেন নিয়মিত রাখছেন।

ক্রেডিট কার্ড
প্রতীকী ছবি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় ক্রেডিট কার্ড ঋণে ঝুঁকছে দেশের একটি জনগোষ্ঠী। ফলে দিন দিন ক্রেডিট কার্ডে ঋণ বাড়ছে। ঋণবৃদ্ধির পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডে অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। অনেক গ্রাহক ক্রেডিট কার্ডে ঋণ নিয়ে মাস শেষে ন্যূনতম টাকা জমা দিয়ে কার্ডের লেনদেন নিয়মিত রাখছেন।

গত সেপ্টেম্বর শেষে ক্রেডিট কার্ডে ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে কার্ডে ঋণ ছিল ৫ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ঋণ ছিল ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা।

কার্ডের ঋণ বাড়ার জন্য কয়েকটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশই চাকরিজীবী। করোনার কারণে তাঁদের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। আবার অনেকের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এর ফলে কার্ডে ঋণ বেড়ে গেছে। আবার কার্ড ব্যবহারকারীদের অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। ফলে আদায়ও নেই। এসব ঋণে সুদ যুক্ত হচ্ছে, ন্যূনতম টাকা জমা দিয়ে অনেকে খেলাপি হওয়া ঠেকিয়ে রেখেছেন।

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের দি সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় আমরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবসাতেও চাপ অনুভব করছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কার্ডের ঋণে ১৭ শতাংশ গ্রাহক করোনার কারণে ঋণ পরিশোধে ছাড় সুবিধা নিয়েছিলেন।

তাঁদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ গ্রাহক ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে ঋণ শোধ করছেন না। এটাই মূল সমস্যা। কার্ড ব্যবহারকারীদের বড় অংশই বলছেন, আয় সাপেক্ষে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা।’

ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডে নতুন গ্রাহকও বাড়ছে। একাধিক কার্ড ব্যবহার করছেন, এমন গ্রাহকের সংখ্যাও বেড়েছে। গত অক্টোবর শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক বেড়ে হয়েছে ২০ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৭ জন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে গ্রাহক ছিল ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৯ জন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গ্রাহক বেড়ে হয় ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ২৪২ জন। ২০২১ সাল শেষে ক্রেডিট কার্ডে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এখন যা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কার্ড বিভাগের কর্মকর্তারা।

করোনার কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালের বড় সময় ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপি থেকে বিরত থাকার সুযোগ ছিল। চলতি বছরে এসে এই সুযোগ বাতিল হয়ে যায়। ক্রেডিট কার্ডে এখন ২০ শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ক্রেডিট কার্ডে সুদ আরোপ শুরু হয় ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের পর। বর্তমানে ব্যাংকগুলো ৪৫ দিন পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডে ঋণসীমার বিপরীতে ৫০ শতাংশের বেশি নগদ উত্তোলন করা যায়।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একমাত্র কার্ডের ব্যবসা করছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির রিটেইল ব্যবসা বিভাগের প্রধান খুরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কার্ডে ঋণ বাড়ছে, সঙ্গে খেলাপিও। আবার অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য ক্রেডিট কার্ড বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে কার্ডের ব্যবসাও সেভাবে বাড়ছে না।’

ক্রেডিট কার্ডে বেশির ভাগ গ্রাহকই সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করে সুদ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে সবার ঋণস্থিতি থাকে না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ডে ঋণ ছিল, এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১০ লাখ ৩৮ হাজার। ২০২১ সালে যা বেড়ে হয় ১১ লাখ ১৯ হাজার। গত সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৬৯ হাজারে।