বিমা
বিমা

শরিয়াহভিত্তিক জীবনবিমা পণ্য ‘তাকাফুল’ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে

জীবনবিমা খাতে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক, অর্থাৎ ইসলামি পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এ পণ্যের নাম ‘তাকাফুল’। গ্রাহকদের আগ্রহের কারণে জীবনবিমা কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে তাকাফুল চালু করছে। গার্ডিয়ান লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের ইসলামি পণ্যের নাম গার্ডিয়ান তাকাফুল। এ ছাড়া রয়েছে মেটলাইফ তাকাফুল জীবনবিমা পলিসি, ন্যাশনাল লাইফের ইসলামি তাকাফুল এবং প্রগতি লাইফের ইসলামি সঞ্চয়ী পরিকল্পনা।

কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, নানা কারণে যাঁরা প্রচলিত বিমাপণ্যে স্বস্তি পান না, তাঁদের জন্য তাকাফুল একটি বিকল্প উপায়। জীবন, শিক্ষা, সঞ্চয়ভিত্তিক—এ তিন ধরনের পরিকল্পনায় এই মডেল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশে তাকাফুল পণ্যের এখনো ব্যাপক প্রসার হয়নি। পণ্যটি নিয়ে কোম্পানিগুলো এগোচ্ছে।

অনেকে বলছেন, প্রচলিত বিমাব্যবস্থায় সুদ ও অন্যান্য অতিরিক্ত অনিশ্চয়তার উপাদান রয়েছে, যা ধর্মীয়সহ অন্যান্য অনুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সুরক্ষা ও সঞ্চয়ের প্রয়োজন স্বীকার করেও তাঁরা বিমা পলিসি করতে আগ্রহী হন না। এই বাস্তবতায় তাকাফুল বা শরিয়াহভিত্তিক বিমা মডেল নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তাকাফুল কীভাবে কাজ করে

‘তাকাফুল’ শব্দের অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা। এ ধারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিমাকাঠামোয় অংশগ্রহণকারীরা একটি যৌথ তহবিলে অর্থ জমা করেন। এই অর্থ অনুদান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নির্ধারিত ঝুঁকির মুখে পড়া কোনো সদস্যকে এ তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়। অর্থাৎ ঝুঁকি এখানে একটি সমষ্টিগত দায়, যা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। কোম্পানি মূলত তহবিলের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করে। পরিচালনার জন্য তারা নির্দিষ্ট মাশুল (ফি) নিতে পারে বা বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ পেতে পারে।

কোম্পানিগুলো বলছে, প্রচলিত বিমাপণ্যের সঙ্গে তাকাফুলের মূল পার্থক্য এখানেই। প্রচলিত ব্যবস্থায় গ্রাহক প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন এবং কোম্পানি ঝুঁকি গ্রহণ করে। অর্থাৎ গ্রাহক ও কোম্পানির মধ্যে সম্পর্কটি মূলত বাণিজ্যিক চুক্তিনির্ভর। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সুদভিত্তিক নানা খাতে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকে। অন্যদিকে তাকাফুলে তহবিল আলাদা রাখা, শরিয়াহসম্মত খাতে বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছ হিসাব পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে দাবি পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত অর্থ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টনের বিধানও থাকে।

তাকাফুল সাধারণত মুদারাবা বা ওয়াকালাহ মডেলে পরিচালিত হয়। মুদারাবা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে অংশগ্রহণকারী ও ব্যবস্থাপকের মধ্যে ভাগ হয়। ওয়াকালাহ পদ্ধতিতে কোম্পানি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা মাশুল গ্রহণ করে এবং তহবিল পরিচালনা করে। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য থাকে ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে একটি নৈতিক ও স্বচ্ছ আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা।

কারা কী বলছেন

মেটলাইফের হেড অব কমিউনিকেশনস সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাকাফুল জীবনবিমা পলিসির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এ ধরনের পণ্যের অধীনে যত প্রিমিয়ামই দেওয়া হোক না কেন, পলিসি চলমান থাকা অবস্থায় বিমা নিরাপত্তার অধীনে বিমা করা ব্যক্তির মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়া হয়। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা দুর্ঘটনাজনিত স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতার ক্ষেত্রেও অভিহিত মূল্যের দ্বিগুণ টাকা দেওয়া হয়। স্থায়ী দুর্ঘটনা অথবা অসুস্থতাজনিত সম্পূর্ণ অক্ষমতার ক্ষেত্রে পলিসি মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য দেওয়া হয় মওকুফ সুবিধা।

তবে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে বলে জানা গেছে। কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু নামের আগে ‘ইসলামি’ শব্দ ব্যবহার করলেই আস্থা তৈরি হয় না। তহবিলের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, প্রশাসনিক ব্যয় কত, শরিয়াহ তত্ত্বাবধান কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন। আলাদা হিসাব সংরক্ষণ, নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং শক্তিশালী শরিয়াহ বোর্ডের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া তাকাফুলের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা দৃঢ় হবে না। যেসব কোম্পানি তাকাফুল চালু করেছে, তারা এসব ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গার্ডিয়ান লাইফ ইনস্যুরেন্সের সিইও শেখ রাকিবুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দিনে দিনে দেশে শরিয়াহভিত্তিক বিমাপণ্যের বাজার বড় হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বাজার এত বড় হয়ে গেছে যে আমরা আস্থা পাচ্ছি। শুধু শহর নয়, গ্রামের দিকেও যাচ্ছি আমরা। এ ধরনের পণ্যের প্রসার হলে শুধু গ্রাহক নয়, কোম্পানিগুলোও লাভবান হবে বলে আমরা আশাবাদী।’