প্রাক বাজেট আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। আজ দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির সম্মেলন কক্ষে
প্রাক বাজেট আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। আজ দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির সম্মেলন কক্ষে

শেয়ারবাজারে এসএমইর জন্য কর অবকাশ সুবিধা দাবি, আয়করে ছাড় চায় ব্যাংক

আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট করহার কমিয়ে ৩০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। এ ছাড়া ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মূলধনি আয়কে করমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসএমই খাতের কোম্পানির জন্য পাঁচ বছরের কর অবকাশ সুবিধা চেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ।

আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাব দেয় সংগঠন দুটি। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।

প্রাক্‌–বাজেট আলোচনায় দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার–সংশ্লিষ্ট আটটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংগঠনগুলো হলো অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)।

অনুষ্ঠানে এবিবির চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, কিছুদিন আগেও ট্রেজারি বিল–বন্ডের মূলধনি আয়ে কোনো কর ছিল না, কিন্তু এখন ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। এটি প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘এটি ব্যাংকের একটা আয়। ব্যাংক তার অন্যান্য আয়ের ওপরে সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর দেয়। আর ট্রেজারি বন্ডের অগ্রিম আয়কর দেয় মাত্র ১৫ শতাংশ। এটি সাড়ে ৩৭ শতাংশ কেন হলো না, সেটিই তো আমার প্রশ্ন।’

সভায় এবিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে একাধিক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এবং অনেক ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু করসুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, বিশেষ করে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনিংকে ব্যয় হিসেবে বিবেচনার দাবি জানানো হয়।

এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০০৬ সালের আগে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে যে প্রভিশন ব্যাংক রাখত, তা ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হতো। পরে প্রজ্ঞাপন জারি করে এটি করযোগ্য করা হয়।

তবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, প্রভিশনিংয়ের পরের ধাপ হচ্ছে রাইট অব বা অবলোপন। রাইট অব করলে তা ব্যয় হিসেবে দাবি করা যায়, কিন্তু ব্যাংকগুলো যথাযথভাবে তা করছে না।

আলোচনায় এবিবির প্রতিনিধিরা বলেন, বর্তমানে ১০ লাখ টাকার বেশি মেয়াদি আমানত বা ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ কারণে অনেক অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে না। এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁরাই বারবার করের চাপ বহন করছেন। এই করবৈষম্য দূর করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্রের বিধান থাকা জরুরি।’

আরও যেসব প্রস্তাব

সভায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসএমই কোম্পানির জন্য পাঁচ বছরের কর অবকাশের সুবিধা চেয়েছেন ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই কর প্রণোদনা এসএমই কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির বিষয়ে আগ্রহ বাড়াবে। তাতে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়বে। সরকারেরও রাজস্ব বাড়বে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়াতে অনিবাসী ব্যক্তি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মূলধনি মুনাফাকে পাঁচ বছরের জন্য কর অব্যাহতির সুপারিশ করেছে ডিএসই। বর্তমানে এই কর ১৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা দেখলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমনিতে আসবেন। বিদেশি বা এসএমই কোনো ক্ষেত্রেই কর অব্যাহতির দেওয়ার নেই।

সভায় বিএবির পক্ষ থেকে রাজস্ব আয় বাড়াতে কয়েকটি পরামর্শ দেওয়া হয়। সংগঠনটি জানায়, বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা অনেক হলেও এদের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজারই নিয়মিত কর দিচ্ছে। সব কোম্পানিকে তদারকির আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাঈদ আহমেদ বিমা কোম্পানির করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ৩৭ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংকের আয় বিমা কোম্পানির চেয়ে অনেক বেশি। সেবা খাতের মতো বিমা কোম্পানির করপোরেট করও ২৫ শতাংশ করার দাবি জানান তিনি।

সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে কর–জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এটিকে এক বছরের মধ্যে ৫০ শতাংশ বাড়াতে চাই। এ ছাড়া খুব শিগগির অনলাইনে আয়কর রিফান্ড (কর ফেরত) ব্যবস্থা চালু হবে। করদাতার যতটুকু রিফান্ড পাওনা থাকবে, তা তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাবেন।