বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা
বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে ভারতীয় ব্যবসায়ী দল ঢাকায়

উভয় দেশের মধ্যকার ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানান বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা।

দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) উচ্চপর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল আজ সোমবার ঢাকা সফরে এসেছে। তিন দিনের এ সফরে প্রতিনিধিদলটি আগামীকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করবে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা জানান, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন শিল্প খাতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে।

১৮ সদস্যের ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। প্রতিনিধিদলে আরও আছেন গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ প্রেসিডেন্ট রাকেশ স্বামী, ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনালের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সুচিত্রা কে এল্লা, দ্য ইনফ্রাভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা ট্রাস্টি বিনায়ক চ্যাটার্জি, অরবিন্দ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পরম শাহ, এলএমডব্লিউ গ্লোবালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পি জে রাজেশ, মাহিন্দ্রা গ্রুপের আঞ্চলিক প্রধান রাজেশ গুপ্ত, গোদরেজ কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কৃষ্ণা খাটোওয়ানি, ফোর্বস মার্শালের গ্রুপ হেড (ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনস) দীপক শর্মা, অ্যাপোলো হসপিটালসের গ্রুপ হেড (ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনস) এম এস গুরু প্রসাদ প্রমুখ।

সম্ভাবনাময় খাতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়াতে ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়ে ভুল–বোঝাবুঝি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার ওপরও জোর দেওয়া হবে।
—ফজলুল হক, প্রশাসক, এফবিসিসিআই।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সফরে উভয় দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান ও সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলায় গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের বৈঠক হবে। পরে বেলা একটায় রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে এফবিসিসিআই আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ সভায় অংশ নেবে প্রতিনিধিদলটি। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ ১০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের ১১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৭ দশমিক ৮২ শতাংশ কম। একই অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১১ দশমিক ২২ শতাংশ কম। চীনের পর ভারত থেকেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ।

দুই দেশের বাণিজ্যে টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ সফর করছে। গত বছরের এপ্রিলে ভারত থেকে বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে। এরপর বাংলাদেশি পণ্যে তিন দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করে ভারত। ১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা-সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও কাঠের আসবাবে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে ভারত।

বিধিনিষেধের কারণে পাট ও পোশাকপণ্য স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এসব পণ্য শুধু ভারতের মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করতে হয়। খাদ্যপণ্য ও কোমল পানীয়, কাঠের আসবাব, তুলা-সুতার বর্জ্য এবং প্লাস্টিক পণ্য বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি করা যাচ্ছে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এই বিধিনিষেধে স্থলবন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নে স্থলবন্দর খুলে দিতে ভারতের ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেড ফাইবারের (এমএমএফ) সুতা ও কাপড় উৎপাদনে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে।

এফবিসিসিআই সূত্র জানায়, আগামীকালের মধ্যাহ্নভোজ সভায় ফেডারেশনের সহায়ক কমিটির ১৬ সদস্যের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদের নেতা, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা এবং ভারতের সঙ্গে ব্যবসা রয়েছে, এমন ব্যবসায়ীরা উপস্থিত থাকবেন।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক আজ সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়াতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করে বাণিজ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খাতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়াতে ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়ে ভুল–বোঝাবুঝি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার ওপরও জোর দেওয়া হবে।