বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের
বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের

নামীদামি আবাসন প্রতিষ্ঠানও নিয়মের ব্যত্যয় করছে: গৃহায়ণমন্ত্রী

দেশের নামীদামি আবাসন প্রতিষ্ঠানও নিয়মের ব্যত্যয় করছে বলে মন্তব্য করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেন, ঢাকার ভেতরে ভবনের নকশার অনুমোদন দিচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এর মধ্যেও অনেক ভবন নকশা ছাড়াই হচ্ছে। এখন সেগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, শুধু গুলশান, বনানীর লেক ও হাতিরঝিল লেক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ছয়বার বৈঠক করেছেন। কীভাবে পরিবেশ ঠিক করা যায়, তা নিয়ে।

জাকারিয়া তাহের বলেন, ‘গুলশান, বনানী ও বারিধারায় যত বাড়িঘর আছে, তার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিকল্পনার সময় যেসব সেপটিক ট্যাংক ও পানি শোধন কূপ (সোকওয়েল) থাকার কথা ছিল, সেগুলো করা হয়নি। আমাদের নামীদামি আবাসন প্রতিষ্ঠান ভবন করে আসছে, তবে বর্জ্য পরিশোধনের জন্য এসটিপি করেনি।’

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্যুয়ারেজ থেকে সরাসরি দূষিত পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। এ নিয়ে আমরা গুলশান, বনানী ওবারিধারা সোসাইটির সঙ্গে তিন–চারবার সভা করছি। আমরা যদি হাতিরঝিল ঠিক করতে না পারি, তাহলে সারা দেশ কীভাবে ঠিক করব।’

বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। আজ বুধবার রাজধানীর বনানীতে শেরাটন হোটেলে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেটের (ইউডিডি) মাধ্যমে এই প্রথম প্রায় ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রথমে মহানগর নিয়ে কাজ করছি। এরপর আমাদের বড় শহর থেকে শুরু করে একদম উপজেলা পর্যায়েও যেন প্রকৃত অর্থে মাস্টার প্ল্যান করা যায়, তা নিয়ে কাজ করব। আমরা অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করব, অর্থাৎ কোথায় কী হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, যাঁরা এর মধ্যে নকশা ছাড়া ভবন করছেন বা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, তাঁদের জন্য বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এটা নিয়ে কাজ চলছে। মাসখানেকের মধ্যে হয়তো মন্ত্রিসভায় উঠবে। এটা পাস হলে আইন আরও শক্তিশালী হবে। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর জনসংখ্যা, আবাসন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন ও গণপরিবহনসহ নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় আলাদা কর্তৃপক্ষের অধীন। এই পরিস্থিতিতে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঢাকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, দেশের বাস্তবতায় নগর পরিকল্পনা করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার আদলে এখানে পরিকল্পনা করা যাবে না। তাদের পর্যাপ্ত জমি আছে। অভিজ্ঞ লোকজন ও সব ধরনের সুযোগ–সুবিধা আছে, আমাদের যা নেই।

শুধু উচ্চপ্রযুক্তি নয়, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসই স্মার্ট আবাসনের প্রাণ বলে মনে করেন স্পেস জিরো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) স্থপতি ফয়েজ উল্লাহ। তিনি বলেন, শুধু উচ্চপ্রযুক্তি, সৌরবিদ্যুৎ বা নানা ধরনের গ্যাজেট নয়; বরং স্মার্ট আবাসনের অর্থ হলো, বাড়িতে প্রাকৃতিকভাবে আলো-বাতাস খেলা করবে। এর সঙ্গে সাশ্রয়ী জ্বালানি ও পানির ব্যবহার আর হাঁটাচলার সুবিধা নিশ্চিত করাই স্মার্ট আবাসনের মূল বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে আবাসন খাতকে স্মার্ট ও টেকসই করতে নতুন করে বিপুল সম্পদ সংগ্রহের চেয়ে বিদ্যমান নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, অর্থায়ন ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ভবন নিরাপদ করার জন্য দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো—সঠিক ডিজাইন; অন্যটি নির্মাণকালীন তদারকি। আমাদের ভালো বিল্ডিং কোড আছে। পেশাজীবীরা যদি সেই কোড অনুযায়ী ডিজাইন করেন, তাহলে ভবনের ডিজাইন মোটামুটি মানসম্মত হবে। কিন্তু নির্মাণকালীন তদারকির জায়গায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি আছে।

ইশতিয়াক আহমেদ আরও বলেন, বড় বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের সব ভবনের নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার মতো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা এখনো নেই।

স্বাধীনতার পর দেশের প্রধান শহরগুলোতে যেসব নগর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার প্রায় সবই ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, একের পর এক মহাপরিকল্পনা, কাঠামো পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা করা হলেও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।

স্মার্ট আবাসন শুধু চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলেও মনে করেন আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের সঙ্গে বাসস্থান, পরিবহন, সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলো জড়িত। এসব সুবিধা নাগরিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে অপরিহার্য।

এবিসি রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শ্রাবন্তী দত্ত বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব আবাসনের কাঠামো বা নীতি প্রণয়নের সময় যদি সেগুলো ব্যয়বহুল মডেলে পরিণত করা হয়, তাহলে এই ভবনগুলো শেষ পর্যন্ত বিলাসবহুল পণ্য হয়ে যাবে। যাঁরা সবচেয়ে বেশি পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন, যাঁরা জ্বালানিসংকটের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে চান, তাঁরা কখনোই সেই আবাসন সুবিধা নিতে পারবেন না।’

শ্রাবন্তী দত্ত আরও বলেন, ‘আমাদের ওপর দুই দিক থেকে চাপ আছে। একটি হলো রাজউক বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা। আরেকটি হলো ভবনের মান নিশ্চিত করা। শুধু মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব একটি পক্ষের ওপর ছেড়ে দিলে কাজে বিচ্যুতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ভবন নির্মাণে মান নিশ্চিত করা, নিয়ম মেনে চলা, সনদ দেওয়া ও বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ তদারকি খুবই প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, নাসির সিনট্যাক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাসিম বিশ্বাস প্রমুখ।