অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ

নিজেকে ৭০–৮০ নম্বর দিলেন অর্থ উপদেষ্টা, আরও যা বললেন

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে দেড় বছরের অভিজ্ঞতায় নিজের কাজের মূল্যায়ন করেছেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। নিজেকে তিনি ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ বা ৮০ দিয়েছেন। বলেছেন, অনেক উদ্যোগ শুরু করা হলেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। তবে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই জনগণের স্বার্থে কাজ করেছেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা এ কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। তবে আমি খুব বাস্তববাদী মানুষ। নিজেকে ১০০ নম্বর কেন দেব? অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরুও করেছি। কিন্তু শেষ করে যেতে পারিনি। নিজেকে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নই।’

অনেক আগেই সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে নিজের কোনো আইনি জটিলতার আশঙ্কাও দেখছেন না তিনি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সমালোচনা করবেন, কিন্তু পুরো চিত্রটা দেখবেন। ১৭-১৮ মাসে কিছুই করা হয়নি, এমন বলা ঠিক নয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এনবিআরকে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে কর নীতিমালার একটি নির্দেশিকা রেখে যাচ্ছি, যা পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে।

ব্যাংক খাত

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। পরিচালনা সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি। চার বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বড় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের মুখে পড়েননি।

ব্যাংক খাতকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, খেলাপি ঋণ, আস্থাহীনতা ও কম ঋণ বিতরণ অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। আমানত কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এদিকে অর্থনীতির আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হওয়া। কর্মসংস্থান না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না।

অর্থ পাচার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কোন কোন দেশে, কারা অর্থ পাচার করেছে, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন। বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পরবর্তী সরকার এ বিষয়ে মনোযোগ দিলে তথ্যগুলো কাজে লাগাতে পারবে।

পুঁজিবাজার

পুঁজিবাজার নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের সমস্যার কারণে সংস্কার কার্যক্রম ধীরগতির হয়েছে। তবে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইকুইটি ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন অপরিহার্য। বিশ্বের সব দেশেই বেসরকারি খাতের জন্য শেয়ার ও বন্ড মার্কেট গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়।

চ্যালেঞ্জ নিয়ে যা বললেন

নির্বাচিত সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে অর্থ উপদেষ্টা জানান, অর্থনীতিকে কার্যকর করা দরকার। ব্যবসা ও শিল্প খাত সচল না হলে কর্মসংস্থান হবে না। তবে এখনো সীমিত কয়েকটি রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরশীল দেশ। হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো মডেলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) শক্তিশালী করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো একটি বড় চাপ, যা মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়েই মূল্যস্ফীতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতির বিষয়।

জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সৌর জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর ড্রিলিং এবং বিকল্প জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তি উন্নয়নে আরও জোর দিতে হবে।

আগামী সরকারের প্রতি অর্থ উপদেষ্টার মূল পরামর্শ হলো নতুন করে সবকিছু শুরু না করে চলমান সংস্কারগুলোকে সংহত করা। তিনি বলেন, ভালো কাজগুলো ধরে রাখুন, সমন্বয় বাড়ান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্ত করুন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করা গেলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরবে।