বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং এমজিএইচ গ্রুপের এমডি আনিস আহমেদসহ অন্যরা। আজ সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে
বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং এমজিএইচ গ্রুপের এমডি আনিস আহমেদসহ অন্যরা। আজ সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে

প্রথম বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনাল করবে এমজিএইচ

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে বেসরকারি উদ্যোগে দেশে প্রথম কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি এমজিএইচ গ্রুপ। কর্ণফুলী নদীর তীরে বন্দর থেকে ইজারা নেওয়া জমিতে এই টার্মিনাল নির্মাণ করবে গ্রুপটি। আজ সোমবার বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টার্মিনালের জন্য জমি ইজারা নেওয়ার চুক্তির পর এ তথ্য জানায় গ্রুপটি।

প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এমজিএইচ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস পতেঙ্গায় সাত একর জমি ইজারা নিয়েছিল। ২০ বছরের জন্য ইজারা নেওয়া এই জমিতেই টার্মিনাল নির্মাণ করবে গ্রুপটি, যেখানে ২৫০ মিটারের একটি জেটি থাকবে। অর্থাৎ টার্মিনালে একটি কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যাবে।

চুক্তি শেষে বন্দর ভবনে এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮ মাসে এই টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ হবে ৫৫০ কোটি টাকা। টার্মিনালে মাসে ৪০ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো–নামানোর সক্ষমতা থাকবে। এতে অন্তত ১৮০ জনের কর্মসংস্থান হবে।

এমজিএইচ যেখানে টার্মিনাল নির্মাণ করবে, তার পাশেই নদীর উজানে নতুন একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। গত বছরের ১৭ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে বন্দরের এ–সংক্রান্ত চুক্তিও হয়। চুক্তি অনুযায়ী, তারা তিন বছরে টার্মিনাল নির্মাণ করে ৩০ বছর পরিচালনা করবে। আয় ভাগাভাগি করবে বন্দরের সঙ্গে। অর্থাৎ এপিএম টার্মিনালস চালু হওয়ার আগে এমজিএইচ গ্রুপের টার্মিনাল চালু হতে পারে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এই চারটি হলো জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি এবং আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনাল। বাংলাদেশে কনটেইনারে আমদানি–রপ্তানির ৯৯ শতাংশই এই চার টার্মিনাল ব্যবহার করে আনা–নেওয়া হয়। নতুন এই চারটির বাইরে পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরে এপিএম টার্মিনালসের নতুন টার্মিনাল নির্মাণের অপেক্ষায় আছে। এখন নতুন করে টার্মিনাল নির্মাণের ঘোষণা দিল এমজিএইচ।

প্রস্তাবিত টার্মিনালটির একটি বড় সুবিধা হলো অবস্থান। এটি সাগরের সবচেয়ে কাছাকাছি হওয়ায় অন্য টার্মিনালের তুলনায় কম সময়ে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। মোহনা থেকে ২ দশমিক ৬০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত প্রস্তাবিত টার্মিনালে জাহাজ আনা–নেওয়ায় ৩০ মিনিট সময় লাগতে পারে। এমজিএইচ গ্রুপ জানিয়েছে, সাগর থেকে খুব কাছে অবস্থানের কারণে প্রতিবার জাহাজ ভেড়ানোর ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৩ টন জ্বালানি সাশ্রয় হবে, যা শিপিং লাইনগুলোর খরচ কমাবে।

টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮ মাসে এই টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ হবে ৫৫০ কোটি টাকা।
আনিস আহমেদ, এমডি, এমজিএইচ গ্রুপ

জমির আয়তন তুলনামূলক কম হলেও টার্মিনালের কার্যকারিতা বাড়াতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান আনিস আহমেদ। তিনি বলেন, ইয়ার্ডে একসঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একক কনটেইনার রাখা যাবে। কনটেইনারের অবস্থান সময় কমিয়ে দ্রুত ওঠানো–নামানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হবে। এ জন্য তিনটি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন বসানো হবে।

টার্মিনালটি পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ টার্মিনাল’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে এমজিএইচের। গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কনটেইনার ওঠানো–নামানো ও স্থানান্তর কাজে ব্যবহৃত যানবাহন হবে বৈদ্যুতিক। পাশাপাশি সোলার রুফটপ, সোলার রোড প্যানেল এবং বিশেষায়িত সৌর অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

১৯৯২ সালে এমজিএইচ গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। তবে গ্রুপটির চেয়ারম্যানের পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস আরও পুরোনো। ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মায়ের্সক লাইন ১৯৮৫ সালের ২৫ জুলাই বাংলাদেশে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরুর সময় অংশীদার ছিলেন এমজিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ গাজীউল হক। পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদ গাজীউল হক শেয়ার ছেড়ে দেন।

বর্তমানে বিশ্বের ২৭টি দেশে ব্যবসা রয়েছে গ্রুপটির। গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পোর্টলিংক লজিস্টিকস সেন্টার আমদানি–রপ্তানি কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছে ২০০৩ সাল থেকে। বেসরকারি এই ডিপো বছরে আমদানি–রপ্তানি পণ্যবাহী দেড় লাখের বেশি কনটেইনার ব্যবস্থাপনা করছে। শিপিং ও লজিস্টিকস খাতে মূল ব্যবসা ছাড়াও ব্যাংকিং, পরিবহন ও কুরিয়ার সেবা, খাদ্য ও পানীয়, স্বাস্থ্যসেবাসহ বহুমুখী খাতে ব্যবসা রয়েছে এমজিএইচের। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে সাড়ে তিন হাজার লোকের।

চুক্তি সই অনুষ্ঠান

আজ সোমবার বন্দর বোর্ড কক্ষে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এমজিএইচ গ্রুপের মধ্যে চুক্তি সই হয়। ৭ একর জমি বছরে ১৫ কোটি টাকায় ভাড়া নেওয়ার এই চুক্তিতে সই করেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান ও এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ।

এমজিএইচের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এমজিএইচ টার্মিনালের চুক্তি স্বাক্ষর আমাদের মেরিটাইম শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এমজিএইচ টার্মিনাল জাহাজ ঘোরার সময় এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, যা বিশ্ববাজারে আমাদের রপ্তানিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।’