বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে দেশের সিইওরা সতর্ক। তবে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের আয় এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা আশাবাদী। জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেক সিইও আগামী তিন বছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির বিষয়ে অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী।
১১ শতাংশ সিইও বলেছেন, তাঁরা আগামী তিন বছরে কোম্পানির প্রবৃদ্ধির বিষয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। ৪০ শতাংশ খুবই আত্মবিশ্বাসী। আরও ২৯ শতাংশ বলেছে, তারা আত্মবিশ্বাসী, তবে সংযত।
সিইওরা মনে করছেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। পাশাপাশি সাইবার ঝুঁকি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, শুল্কনীতি ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতও উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঝুঁকির কারণে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও রক্ষণশীল হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাইসওয়াটারহাউস কুপার্স বা পিডব্লিউসির জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। ৯৫টি দেশ ও অঞ্চলের ৪ হাজার ৪৫৪ জন সিইওর বৈশ্বিক জরিপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ৪৫ জন সিইও এতে অংশ নেন।
প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সিইওরা নতুন খাতে প্রবেশ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি আগ্রাসী। ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে তাঁদের প্রতিষ্ঠান নতুন শিল্প বা খাতে প্রবেশ করেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় যা অনেক বেশি।
তবে এই সম্প্রসারণ থেকে যে তারা আয় করতে পারছে, বিষয়টি তেমন নয়। নতুন খাতে প্রবেশ করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের মোট আয়ের ২০ শতাংশের বেশি এসেছে এসব কার্যক্রম থেকে।
এআই: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার দ্বৈত বাস্তবতা
জরিপটি মূলত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সিইওরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আশাবাদী।
তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ বাড়ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে চাপ সৃষ্টি করছে।
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এআইকে ব্যবসার মূল কাঠামোয় পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। মাত্র প্রতি পাঁচজন সিইওর একজন জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে বড় বা খুব বড় পরিসরে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে সীমিত প্রয়োগের মধ্যেও ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ২০ দশমিক ৫ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, এআই ব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব বেড়েছে। পাশাপাশি ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, এআই খরচ কমাতে সহায়তা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এআই ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিচালনাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তবে বিষয়টি এখনো পাইলট পর্যায়ে আছে, পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এআই ব্যবহারে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ব্যবসার পাঁচটি প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে চাহিদা সৃষ্টি, সহায়ক সেবা ও কৌশলগত দিক নির্ধারণের মতো ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের হার বেশি।
বাংলাদেশের প্রতি পাঁচজন সিইওর একজন জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান চাহিদা সৃষ্টি ও কৌশলগত দিক নির্ধারণ—উভয় ক্ষেত্রেই এআই ব্যবহার করছে। এই হার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় বেশি।
তবে এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো কিছু ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় মানের চেয়ে পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে সহায়ক সেবা, পণ্য, সেবা ও গ্রাহক-অভিজ্ঞতাসংক্রান্ত কার্যক্রমে বিশ্বব্যাপী প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশে সেই হার তুলনামূলক কম।
তবে কৌশলগত পরিকল্পনা ও চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক গড় মানের সমান বা তার চেয়েও ভালো। এ থেকে বোঝা যায়, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিচালনাগত কার্যক্রমে এআই নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ আঞ্চলিকভাবে পিছিয়ে থাকা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানজুড়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে এআই ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তোলা ও তা সম্প্রসারণ করা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআইয়ের ব্যবহার এখনো সীমিত পরিসরে। ফলে এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে অসম প্রস্তুতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সিইওদের ভাষ্যমতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে কম। এতে বোঝা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বেরিয়ে এআইকে বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।
কৌশলগত স্পষ্টতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি আছে। ৪০ শতাংশের কিছু বেশিসংখ্যক সিইও জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এআই-সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রয়েছে। যদিও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান মনে করে, তাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এআই একীভূতকরণে সহায়ক। এই পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা গেছে। পাঁচজনের মধ্যে একজনেরও কম সিইও জানিয়েছেন, তাঁদের এআই টুল প্রতিষ্ঠানের সব প্রাসঙ্গিক ডেটা ও নথির সঙ্গে একীভূত। এই সূচকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উভয় মানদণ্ডের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এআই ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা গড়ে তোলার পথে এটি বড় বাধা।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ: টিকে থাকা ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর
জরিপে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সিইওদের মানসিক উদ্বেগ। ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ সিইওর প্রধান উদ্বেগ হলো, ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানকে টেকসইভাবে পরিচালনার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ তাঁরা নিতে পারছেন কি না, সেটা।
একই সঙ্গে ৪২ দশমিক ২ শতাংশ সিইও মনে করেন, তাঁরা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি, বিশেষ করে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি অনুযায়ী যথেষ্ট দ্রুত পরিবর্তন ঘটাতে পারছেন না। ফলে করপোরেট নেতৃত্বের ওপর একধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
উদ্ভাবনে পিছিয়ে
বাংলাদেশের সিইওরা উদ্ভাবনের গুরুত্ব স্বীকার করেন। তবে বাস্তবতা হলো, বড় পরিসরে নিয়মিতভাবে উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। প্রায় অর্ধেক সিইও মনে করেন, উদ্ভাবন তাঁদের ব্যবসায়িক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বাস্তব চর্চার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
মাত্র ২৯ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, তাঁরা দ্রুত গ্রাহক বা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা করেন। ফলে উদ্ভাবন অনেক ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে। একইভাবে মাত্র ২৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বাহ্যিক অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবনী প্রকল্পে উচ্চমাত্রার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় যা কম। ফলে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে ও কম ঝুঁকি নিয়ে উদ্ভাবনের দিকে ঝুঁকছে।
পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ২৯তম সিইও জরিপে দেখা গেছে, দেশের করপোরেট নেতৃত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখালেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও কাঠামোগত প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে হলে এআই, উদ্ভাবন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু কৌশলকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; বরং একীভূত ব্যবসায়িক রীতি হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।