বাজেট সামনে রেখে প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা। গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে
বাজেট সামনে রেখে প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা। গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে

প্রথম আলোর গোলটেবিল

মানুষের জন্য স্বস্তির বাজেট হোক

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হোক আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ধ্রুবতারা বা মূল লক্ষ্য। এ বাজেট হোক সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির। আর ব্যবসায়ীদের জন্য উচ্চ সুদের হার যেন আর না থাকে। করের চাপ কমানোর পাশাপাশি কর আদায়ে ব্যবসায়ীদের ওপর হয়রানিও যেন কমানো হয়। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষক ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা এসব বিষয় তুলে ধরলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সমানে।

জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, কত প্রবৃদ্ধি হলো, সেই ইতিহাস বলে লাভ নেই। সাধারণ মানুষের কী লাভ হলো, সেটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এমন প্রবৃদ্ধির কোনো মূল্য নেই, যা মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে পারে না।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। বৈঠকে প্রথম আলো সম্পাদক অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে সূচনা বক্তব্য দেন। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বৈঠকে আলোচকদের তোলা বিভিন্ন প্রসঙ্গের জবাব দেন অর্থমন্ত্রী। শুরুতে তিনি বলেন, অলিগার্কি অর্থনীতি থেকে তিনি সরে আসতে চান। প্রত্যেক নাগরিকের যাতে সুযোগের সমান অধিকার থাকে, অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলক থাকে, অর্থনীতির সুফল যেন সবার কাছে যায়—এটাই হচ্ছে তাঁর চাওয়া। এ জন্য সৃজনশীল অর্থনীতিকেও আগামী অর্থবছর থেকে মূল ধারায় আনতে চান এবং এ জন্য আগামী বাজেটে একটি তহবিল রাখবেন।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এমন একটি করনীতি করার জন্য কাজ করছে, যেখানে মানুষ কর দেবেন এবং মনে করবেন যে তিনি একজন করদাতা। এই খাত থেকে এত টাকা নিয়ে নাও, ওই খাত থেকে অত টাকা নিয়ে নাও—এটা কোনো করনীতি হতে পারে না।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থায়নের কাঠামো বদলে গেছে। ফলে আগের মতো দেশ চালালে আর চলবে না। তাঁর প্রশ্ন, ‘১ থেকে ২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার জন্য কি আইএমএফের পেছনে দৌড়াব? নাকি কাল সকালে একটা (ফান্ড) তহবিল গঠন করে নিজের দেশের বাজারে ঢুকাব? বিনিয়োগের বিপরীতে ভালো মুনাফা পেলে কেন আমি অপেক্ষা করব যে কে, কবে আমারে টাকা দেবে, কী শর্তে দেবে? আমার দরকারটা কী?’

শিল্পে ব্যাংক খাতের অর্থায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক চলতি মূলধন দিতে পারে। আবার গাড়ি, বাড়ি কেনার জন্য ঋণ দিতে পারে। অথচ দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ঋণ দিয়ে দেয়। এক ব্যাংক না পারলে চার ব্যাংক মিলে দেয়। এগুলো অদক্ষতা। তাঁর প্রশ্ন, সরকার সব জায়গায় পয়সা দেবে কেন? বাংলাদেশ বিমানকে ১২টি উড়োজাহাজ কেনার খরচ সরকার কেন দেবে? বিমান একটি এন্টারপ্রাইজ। তারা পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিতে পারে।

সরকার এমন একটি করনীতি করার জন্য কাজ করছে, যেখানে মানুষ কর দেবেন এবং মনে করবেন যে তিনি একজন করদাতা।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী

বড় অর্থায়নের জন্য অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারকে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার বদলে উচিত হচ্ছে পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া। পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়ে গেছে, বুঝি। খুব দ্রুত এ বাজারকে কার্যকর করা হবে। পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিলে সুদ দিতে হবে না, যতক্ষণ না ওই প্রতিষ্ঠান পয়সা কামায়। পয়সা কামালেই লভ্যাংশ। অন্যদিকে আছে বন্ড বাজার। ব্যাংকের চেয়ে কম সুদে বন্ড বাজার থেকেও ঋণ নেওয়া যায়। এভাবে ব্যবসায়ের খরচ কমানোর ব্যবস্থা করা হবে।

সুশাসন বনাম সংস্কার নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগের মতো অবস্থা। তবে আমরা সার্বিক সংস্কারে যাচ্ছি। এখন আর ১৩টা অনুমতি লাগবে না। লাগলেও তা এক জায়গা থেকে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।’ শুল্ক বিভাগ, বন্দরের নাম উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবকিছুতেই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় যেতে হবে। দেখেছি যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খরচ বৃদ্ধি শুরু হয়। এখানে পয়সা দিতে হবে, ওখানে দিতে হবে, এই মাশুল, সেই মাশুল—এগুলো করতে করতে ১০ শতাংশ দাম বেড়ে যায়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ব্যবসায়ের খরচটা কমিয়ে আনা।’

একটি নোঙর প্রয়োজন

আগামী অর্থবছরের বাজেটকে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত আগামী বাজেটের ‘ধ্রুবতারা’ বা মূল লক্ষ্য।

কাঠামোগত সংস্কারের অভাব, প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতি, আইএমএফের শর্ত ও জনগণের উচ্চাশা—এই চতুর্মুখ চাপের মুখে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতি হবে। আবার আছে বড় অঙ্কের রাজস্বঘাটতি। ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধির পথে ফেরার জন্য সামষ্টিক অর্থনীতিকাঠামোয় একটি নোঙর প্রয়োজন। তবে বাজেট ঘাটতি কমাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ যেন না কমে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অল্প বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা আছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করপোরেট আয়করে বর্তমানে ২৫ হাজার কোটি টাকার ওপর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচিত হবে করছাড়ের জায়গাগুলো ভালো করে ‘ঝেড়েমুছে’ দেখা। বিদ্যুৎ খাতের করছাড় পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ আছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে শুধু আয়করের ওপর নির্ভর না করে সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর দাবি জানান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি রাজস্ব বৃদ্ধির বিকল্প উৎস হিসেবে সরকারের হাতে থাকা বহুজাতিক ও লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে ছাড়ার পরামর্শ দেন। তবে আমলাদের প্রতিরোধের কারণে এটি সম্ভব হয় না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এনবিআরের উচিত হবে করছাড়ের জায়গাগুলো ভালো করে ‘ঝেড়েমুছে’ দেখা।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হতে পারে কৃষি

বাজেটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে সফলতার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রতি আহ্বান জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, পিপিআরসির চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে আমরা জনপ্রিয় দেখার চেয়ে বেশি সফল দেখতে চাই।’

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান

হোসেন জিল্লুর বলেন, জনপ্রত্যাশা হচ্ছে স্বস্তির বাজেট। উচ্চাভিলাষী বাজেট এ মুহূর্তে জনপ্রত্যাশা নয়। বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে। বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এ আস্থার সংকট অতিক্রম করা বা দূর করা জরুরি। তিনি বলেন, অর্থনীতির নানা খাতেই সংকট বিরাজ করছে। বাজেটের ক্ষেত্রে বড় সংকট, বাস্তবায়নের সংকট।

হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন প্রবৃদ্ধির চালক লাগবে। বর্তমানে আমাদের প্রবৃদ্ধির বড় চালক সেবা খাত। কৃষি খাত হতে পারে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক।’

হোসেন জিল্লুরের মতে, মানুষ এখন আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বাজেটে মানুষের এই সংগতির বিষয়টাকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি। দুই খাতে বাড়তি বরাদ্দে শুধু ভবন তৈরি হবে।

বর্তমানে আমাদের প্রবৃদ্ধির বড় চালক সেবা খাত। কৃষি খাত হতে পারে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক।
হোসেন জিল্লুর রহমান অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বাজেটে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হোক

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) প্রফেসরিয়াল ফেলো সেলিম জাহান বলেন, ‘আমি বাজেটকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হিসেবে দেখতে চাই। বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এর উন্নয়ন–দর্শন থাকা দরকার।’ তিনি বলেন, বাজেটের ভারসাম্য এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে না যায়। ভর্তুকি কমালে জীবনযাত্রার মান কমে যাবে। একদিকে সংস্কার করতে হবে, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে।

সেলিম জাহান বলেন, ‘আমাদের এমন সংস্কার করতে হবে, যা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। কর আদায় বাড়াতে হবে, ব্যয় কমাতে হবে। সংস্কারের পাশাপাশি জনপ্রত্যাশা সামাল দিতে হবে। স্থিতিশীলতা ও গতিময়তার মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কাজের সুযোগ যেন বাড়ে, সেটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

বাজেটে জনপ্রত্যাশা নয়, জনগণের প্রয়োজন মেটাতে হবে বলে মত দেন সেলিম জাহান। বলেন, অনেক উদ্যোগ সবার ভালো লাগবে না, তবে সে জন্য জনগণকে আগে থেকে প্রস্তুত করতে হবে। দেশে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন করতে হবে। মানুষকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহজে যুক্ত করতে হবে। নারীর উন্নয়নের বিষয়গুলো বাজেট আলোচনার থাকা দরকার।

‘উচ্চ সুদের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছি’

টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, দেশে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য আমদানিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক পার্থক্য রয়েছে। তবে এতে ন্যূনতম ১০ শতাংশ পার্থক্য থাকা উচিত।

মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘উচ্চ সুদের কারণে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। এর মধ্যে প্রস্তুত পণ্য আমদানিতে শুল্ক কম থাকলে ব্যবসা করা কঠিন।’ তিনি বলেন, ‘দেশে সুদের হার ১২ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ। কিন্তু চীনে ৪ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৬-৮ শতাংশ ও ভারতে ৮-৯ শতাংশ। এখানেই আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা সময় কম পাই।’

এ ছাড়া গ্যাস-সংকট ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, দেশে বিদ্যুতের দাম এমনিতেই প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। এ ছাড়া দেশে অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট ফেরত পাওয়া যায় না—এই অভিযোগ করে বিষয়টিতে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান মোস্তফা হায়দার। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে দেশে সংযোগশিল্প গড়ে উঠছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ওষুধ খাতে কর ও শুল্কের চাপ

ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান ওষুধশিল্পের কাঁচামালে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, এনবিআর থেকে অগ্রিম কর ফেরত পাওয়া যায় না। এতে ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়ে সিমিন রহমান করব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার পরামর্শ দেন।

ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান

সিমিন রহমান বলেন, ওষুধশিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা চালু করতে হবে। তাঁর মতে, পোশাক খাতের মতো ওষুধশিল্পকেও রপ্তানিমুখী সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়কে পুরোপুরি করমুক্ত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে দীর্ঘ সময় লাগে। অথচ শুরু থেকেই করের বোঝা বহন করতে হয়।

আর্থিক খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে সিমিন রহমান বলেন, ‘এই সংস্কারগুলো করা সহজ কথা নয়, তবে আমাদের সঠিক সংস্কারের দিকেই এগোতে হবে।’ বেভারেজ বা পানীয় শিল্পের ওপর করের হার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই খাতে মোট করের হার ৫৪ শতাংশ, যেখানে ভারতে ৪০ শতাংশ ও ভিয়েতনামে মাত্র ২০ শতাংশ।

নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে দীর্ঘ সময় লাগে। অথচ শুরু থেকেই করের বোঝা বহন করতে হয়।
সিমিন রহমান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ট্রান্সকম গ্রুপ

বিনিয়োগ পরিবেশ এখন ভাঙা ঘর

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিনিয়োগ পরিবেশ এখন একটি ভাঙা ঘর। এই বাড়ি মেরামত না করে যদি আমরা ভাড়াটে বা বিনিয়োগকারী খুঁজতে যাই, তবে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। গত ১৮ মাসে (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে) কিছু বিচ্ছিন্ন সংস্কার হয়েছে, যাকে আমি বলব “মিকি মাউস” রিফর্ম। এমন ছোটখাটো সংস্কার দিয়ে বিনিয়োগের বড় বাধা দূর করা সম্ভব নয়।’

মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ‘তলানিতে’ এসে ঠেকেছে, যা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে বিনিয়োগকে সচল করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বৈচিত্র্যকরণ ও উৎপাদনশীলতা আটকে যাবে।

বর্তমান সময়কে একটি বহুমাত্রিক সংকটের কাল হিসেবে অভিহিত করে মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এটি বিনিয়োগের জন্য এক অশনিসংকেত।’

চলছে কারখানা টিকিয়ে রাখার লড়াই

বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অনেক চালু পোশাক কারখানাও এখন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেকেই ব্যবসা থেকে নিরাপদ প্রস্থান চাইছেন। এসব কারখানা চালু রাখতে বিশেষ তহবিল গঠন এবং ব্যবসা থেকে বের হতে চাওয়া উদ্যোক্তাদের জন্যও বাজেটে আলাদা ব্যবস্থা রাখা দরকার।

অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মুনাফা না হলেও বিক্রির ওপর কর দিতে হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তারা চাপে পড়ছেন। সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ব্যাটারির ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারেরও দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, জ্বালানি ব্যয় কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

চিকিৎসার অভাবে শিশুমৃত্যু উদ্বেগজনক

বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যখন দেখি, ছোট শিশুরা চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, তখন মন ছোট হয়ে আসে। এ জন্য আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’

দেশের পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যবসাগুলো সম্পদ তৈরি করলেও তাদের হাতে নগদ অর্থ কম বলে মন্তব্য করেন মাহবুব উর রহমান। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ব্যবসাই ঋণনির্ভর হয়ে গেছে। ফলে সুদের হার এখন তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাহবুব উর রহমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে অফশোর ব্যাংকিং ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার আহ্বান জানান।

ভোগ্যপণ্যের বাজারে কয়েকটি গ্রুপের দাপট

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষ চার-পাঁচটি গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটা ভয়ানক ব্যাপার।

শুল্কায়ন পদ্ধতির সমালোচনা করে গোলাম মাওলা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে এনবিআরের ট্যারিফ মূল্যের বড় অমিল রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের অভিযোগের মুখে পড়ছেন।

গোলাম মাওলা জিরা ও এলাচির মতো নিত্যপণ্যের উচ্চ শুল্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, এসব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

রেস্তোরাঁ খাতে করপোরেট আধিপত্য

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বড় করপোরেট গোষ্ঠীর আগ্রাসনে ছোট রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারছেন না। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বেকারি ও রেস্তোরাঁ খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল ব্যবহার করে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে তারা। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার রেস্তোরাঁ থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধিত মাত্র ১০ হাজার।

ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ ব্যবসা করতে ১৩ থেকে ১৪টি সরকারি দপ্তরের অনুমোদন লাগে। ডিসি লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্রসহ নানা জটিলতায় ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন। রেস্তোরাঁ খাতের জন্য আলাদা তহবিল, সহজ শর্তে ঋণ এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানান তিনি।