দেশের অর্থনীতির গতি কমে গেছে। বেসরকারি খাত আগের মতো বেশি হারে ঋণ নিচ্ছে না। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা বিনিয়োগে মন্দার ইঙ্গিত দেয়। কমছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। মানুষের আয় যথেষ্ট হারে বাড়ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে নিয়ে এসেছে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল। সেখান থেকে গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে বেসরকারি খাত। ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে ৬ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেবে সরকার।
ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রণোদনা তহবিলের উদ্যোগটি ভালো। দরকার সুষ্ঠুভাবে এই তহবিলের ব্যবহার। সেটা করতে পারলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে নিয়ে এসেছে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল। সেখান থেকে গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে বেসরকারি খাত। ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে ৬ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেবে সরকার।
প্রণোদনা তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পরিকল্পনা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এই তহবিলের ঋণের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম করা হবে, যাতে নয়ছয়ের সুযোগ না থাকে।
যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক পরিকল্পনা করছে, প্রণোদনা তহবিল থেকে যেসব গ্রাহক ঋণ পাবেন, তাঁদের আয় জমা হবে এস্ক্রো হিসাবে। এই হিসাব থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চাইলেই টাকা স্থানান্তর ও খরচ করতে পারে না। এস্ক্রো হিসাবের জমা হওয়া টাকা দিয়ে আগে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হবে। এরপর বাকি টাকা যাবে গ্রাহকের কাছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এই তহবিলের ঋণের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম করা হবে, যাতে নয়ছয়ের সুযোগ না থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে প্রণোদনার টাকা নয়ছয়ের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এবার তা ঠেকাতে নানা পদক্ষেপের চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রণোদন তহবিল থেকে কীভাবে ঋণ দেওয়া হবে, কী কী শর্ত থাকবে, কারা ঋণ পাবেন—এসব বিষয়ে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। পবিত্র ঈদুল আজহার পরেই তা প্রকাশ করা হবে। এর পর থেকে ঋণ নিতে পারবেন ব্যবসায়ীরা।
২০২০ সালে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতের জন্য ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ধরা পড়েছিল যে প্রণোদনা প্যাকেজে নানা অনিয়ম হয়েছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ী কম সুদে টাকা নিয়ে বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ করেছেন। কেউ কেউ তহবিলের অর্থ শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। আবাসন খাতেও বিনিয়োগ করেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত শনিবার ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রণোদনা প্যাকেজের ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সবচেয়ে জোর পাবে বন্ধ কারখানা খোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ জন্য প্রণোদনা তহবিলে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এতে ২ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির আশা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কোনো কোনো ব্যবসায়ী কম সুদে টাকা নিয়ে বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ করেছেন। কেউ কেউ তহবিলের অর্থ শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। আবাসন খাতেও বিনিয়োগ করেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গঠিত গবেষণা সংস্থা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, যাদের ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ আছে—এমন প্রতিষ্ঠান বাছাই করে ঋণ দেওয়া উচিত। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করা যেতে পারে। বন্ধ হয়নি, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় মন্দাভাব আছে—এমন প্রতিষ্ঠানও যেন ঋণ পায়, সেই সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।
প্রণোদনা তহবিল থেকে সৃজনশীল অর্থনীতি (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) খাতেও অনুদান দেওয়া হবে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, খেলাধুলা, থিয়েটার, সিনেমা, সংগীত—এসবকে বিনোদন হিসেবে দেখা হতো এত দিন। এখন দেখা হবে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে।
কর্মকর্তারা আরও বলছেন, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইউনেসকো) পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিশ্বে সৃজনশীল খাত দ্রুত বড় হচ্ছে, যা তরুণদের কর্মসংস্থানের বড় উৎস এবং এ খাত থেকে রপ্তানি আয়ের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য সরকার এ খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে।
যাদের ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ আছে—এমন প্রতিষ্ঠান বাছাই করে ঋণ দেওয়া উচিত। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করা যেতে পারে। বন্ধ হয়নি, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় মন্দাভাব আছে—এমন প্রতিষ্ঠানও যেন ঋণ পায়, সেই সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।বিল্ড চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান
আগের প্রণোদনা প্যাকেজ পুরোটাই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হতো। এবার প্রথমবার অতফশিলি ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থাকে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও আনসার–ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক। এই চার প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে আট হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করবে। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা বড় জনগোষ্ঠী ঋণের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পিকেএসএফ পাবে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই তহবিলের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজি হয়েছে। আমাদের ঋণে ফেরতের হার ৯৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ফলে আমাদের টাকা দিলে ঝুঁকির কিছু নেই।’
গ্রামীণ অর্থনীতি কর্মকাণ্ডের জন্য আনসার–ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। এই ব্যাংক আনসার–ভিডিপি সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করে। তাদের সদস্যসংখ্যা ৬১ লাখ। ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা, যেখানে খেলাপির হার ১৭ শতাংশ।
আনসার–ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা ঋণ নিয়ে কৃষি, এসএমই খাতে ব্যবহার করে।’
আমরা অনেক দিন ধরেই তহবিলের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজি হয়েছে। আমাদের ঋণে ফেরতের হার ৯৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ফলে আমাদের টাকা দিলে ঝুঁকির কিছু নেই।পিকেএসএফের এমডি ফজলুল কাদের
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অন্য উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগ না করে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত ২৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোও এখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
বিনিয়োগ মন্দার প্রভাব পড়েছে দেশের সার্বিক আমদানিতেও। গত জুলাই-মার্চ প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে শিল্প-কারখানার মূলধনি যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমে গেছে। কলকারখানা বন্ধ থাকা এবং নতুন কোনো বিনিয়োগ না হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের প্রবৃদ্ধিতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, তিন বছর ধরে কমতে কমতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশে। বাংলাদেশ বহু বছর ৬ শতাংশ বা তার বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি এবং যথাযথ খাতে অর্থের সঠিক ব্যবহারের ওপর। সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে এটি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যবসায়ীরা কম সুদে ঋণ পেলে তাঁদের তারল্য বাড়বে। কিন্তু তারল্য বৃদ্ধি আর সঠিক বিনিয়োগ এক জিনিস নয়। দেশের মাঝারি ব্যবসা খাতে অনেক খেলাপি ঋণ। মূল্যস্ফীতিও চড়া। এসব যাতে বেড়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
যেসব প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে প্রতিষ্ঠান চালাতে সহায়তা হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠন কারখানা চালুর বিষয়ে অনাপত্তি দিলেই ব্যাংক ঋণ দেবে। এভাবে প্রণোদনা প্যাকেজের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রণোদনা তহবিল নিয়ে দেশের ব্যাংকগুলোর নির্বাহীদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি বাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, এটা যথেষ্ট সাহসী পদক্ষেপ। অর্থনীতিতে কিছুটা গতি তো অবশ্যই আসবে। তবে তাঁর প্রশ্ন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা কীভাবে নেওয়া হবে? সেটা কী ব্যাংকের বিনিয়োগ করা ট্রেজারি বিল-বন্ডের বিপরীতে ৩-৪ শতাংশ হারে রেপো সুবিধা দিয়ে?
মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যবসায়ীরা কম সুদে ঋণ পেলে তাঁদের তারল্য বাড়বে। কিন্তু তারল্য বৃদ্ধি আর সঠিক বিনিয়োগ এক জিনিস নয়। দেশের মাঝারি ব্যবসা খাতে অনেক খেলাপি ঋণ। মূল্যস্ফীতিও চড়া। এসব যাতে বেড়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন তিনি।