গ্যাসের সংকটের কারণে অনেকেই এখন বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন। ফলে পণ্যটির বেচাকেনা বেড়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকানে গ্রাহকদের বৈদ্যুতিক চুলা দেখাচ্ছেন বিক্রেতা।
গ্যাসের সংকটের কারণে অনেকেই এখন বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন। ফলে পণ্যটির বেচাকেনা বেড়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকানে গ্রাহকদের বৈদ্যুতিক চুলা দেখাচ্ছেন বিক্রেতা।

গ্যাস–সংকটে হঠাৎ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার বেচাকেনা

রাজধানীর আদাবর এলাকার বাসিন্দা সিয়াম রায়হান বাসায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর বাসায় সিলিন্ডারে থাকা গ্যাস শেষ হয়ে যায়। এরপর দুই দিন মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কয়েকটি এলাকায় এলপিজির সিলিন্ডার খুঁজেও কিনতে পারেননি। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক চুলা কেনেন তিনি।

সিয়াম রায়হান বলেন, ‘দুই দিন ধরে বাসায় কোনো রান্নাবান্না নেই। বাইরে থেকে খাবার এনে খাচ্ছি। এ জন্য আজ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে এসেছি।’

বর্তমানে দেশে বাসাবাড়ির সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট চলছে। বিশেষ করে তিন দিন ধরে এ সংকট চরম পর্যায়ে গেছে। ভোক্তারা দোকানে দোকানে ঘুরেও সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না। আবার কেউ সিলিন্ডার পেলেও দাম দিতে হচ্ছে দেড়-দুই গুণ। অন্যদিকে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় লাইনের গ্যাসেও চাপ কম। অনেক এলাকায় দিনে লাইনে কোনো গ্যাসই থাকছে না। এমন বাস্তবতায় হঠাৎ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার বেচাকেনা।

রাজধানীর শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী বিশ্বজিৎ বিশ্বাস। তাঁর বাসায় লাইনের গ্যাস ব্যবহার হয়। বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, বাসার লাইনে কোনো গ্যাস নেই। এ কারণে তিন দিন ধরে রান্না বন্ধ। গ্যাসের চাপ কবে ঠিক হবে নিশ্চয়তা নেই। তাই নিরুপায় হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড—এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। এর মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। মোহাম্মদপুরের এইচআর ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে এই চুলা কিনছেন। আবার অনেকে বিকল্প চুলা হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। এমনিতে শীতের সময় বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বেড়ে যায়।

বৃহস্পতিবার ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রিংরোড, শ্যামলী, শেওড়াপাড়ার বেশ কয়েকটি দোকানে ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে কিছু দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্রে (শোরুম) মজুত বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। তারা কোম্পানির কাছে নতুন করে চাহিদা দিয়েছে। আর বাকি দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হয়েছে।

বেচাকেনা বাড়ার কথা জানিয়েছে কোম্পানিগুলোও। দেশে ভিশন ও ভিগো ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা বানায় প্রাণ গ্রুপ। চাহিদার বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তৌহিদুজ্জামান বলেন, এমনিতে শীতের সময় বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি বাড়ে। তবে গ্যাসের সরবরাহ–সংকটের কারণে গত দু-তিন দিনে এটির বিক্রি অনেক বেড়েছে। আমাদের হিসাবে সাধারণ সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি বিক্রি বেড়েছে।

দরদাম কেমন
যেসব কোম্পানি হোম অ্যাপ্ল্যায়েন্স পণ্য তৈরি করে, তাদের প্রায় সবারই বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো, ফিলিপস প্রভৃতি ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা বেশি বিক্রি হয়। এর বাইরে নোভা, প্রেস্টিজসহ বেশ কিছু অপরিচিত ও নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলাও বাজারে পাওয়া যায়। নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা রাজধানীর গুলিস্তানে স্টেডিয়াম মার্কেট, মিরপুর ১ সহ কয়েকটি এলাকায় বেশি পাওয়া যায়।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ইন্ডাকশন চুলার চেয়ে ইনফ্রারেড চুলার দাম কিছুটা বেশি। তবে দুটোই মোটামুটি সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দামে কেনা যায়। অবশ্য এর চেয়ে বেশি দামের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলার দামও কাছাকাছি বা এর চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা কম। তবে এখন চাহিদা বেশি থাকায় পরিচিত ব্র্যান্ডের চুলার কাছাকাছি দামেই নন-ব্র্যান্ডের চুলা বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো বিক্রেতা সুযোগ বুঝে ২০০-৪০০ টাকা বাড়তি দাম চাইছেন।

দুই চুলার পার্থক্য
অনেকে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার পার্থক্য স্পষ্টভাবে জানেন না। ইন্ডাকশন চুলা সরাসরি তাপ তৈরি করে না; এটি তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ নীতিতে কাজ করে। চুলার ভেতরের তামার কয়েল বিদ্যুৎ প্রবাহে পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। এতে পাত্রের তলদেশে ঘূর্ণি তড়িৎ প্রবাহ তৈরি হয়। ফলে তাপ সরাসরি পাত্রেই তৈরি হয় এবং চুলার কাচের উপরিভাগ তুলনামূলকভাবে গরম হয় না।

অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় হ্যালোজেন বা ইনফ্রারেড হিটারের মতো শক্তিশালী হিটিং উপকরণ সরাসরি তাপ উৎপন্ন করে। এই উপকরণ গরম হয়ে ইনফ্রারেড বিকিরণ ছড়ায়, যা সূর্যের আলোর মতো পাত্রকে গরম করে। এটি মূলত পুরোনো ইলেকট্রিক কয়েল চুলার আধুনিক রূপ, যেখানে তাপ সরাসরি স্থানান্তরিত হয়। ফলে চুলা চালু হলে উপরিভাগের কাচের প্লেট লাল হয়ে যায় এবং সেখান থেকেই তাপ বিকিরণ ঘটে।

দুই চুলার মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। কারণ, এই চুলায় যেকোনো ধরনের পাত্রে রান্না করা যায়। বিপরীতে ইন্ডাকশন চুলায় রান্না করতে হলে শুধু নির্দিষ্ট আকারের ফেরোম্যাগনেটিক পাত্র, যেমন লোহার তৈরি পাত্র, কাস্ট আয়রন বা বিশেষ ধরনের স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম, তামা, কাচ বা সিরামিকের পাত্র এতে কাজ করবে না।

ইন্ডাকশন চুলা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তাপীয় দক্ষতা প্রদান করে, যা গ্যাস চুলার চেয়ে বেশি। এর ফলে খুব দ্রুত পানি ফোটানো বা খাবার গরম করা যায়। এতে রান্নার সময় কিংবা বিদ্যুৎ খরচও কম লাগে। পাত্র সরিয়ে নিলে চুলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।