কাঁচা বাজার
কাঁচা বাজার

তেলের দাম ও বৃষ্টির প্রভাবে সবজির বাজার চড়া

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার ১ কেজি ধুন্দুল ৭০-৮০ টাকায় এবং টমেটো ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগেই সবজি দুটির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কম ছিল। দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ, বৃষ্টি ও পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি।

সবজির মধ্যে গত এক সপ্তাহে আরও বেড়েছে পেঁয়াজ, শসা, বেগুন, মরিচ, পেঁপের দাম। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তি। মুদি পণ্যের মধ্যে চিনি, মোটা মসুর, পোলাও চালের দাম বেড়েছে। আর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলেও বাজারে এখনো পণ্যটির সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন বৃষ্টির কারণে সবজির স্বাভাবিক সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সব মিলিয়ে সবজির দামে তার প্রভাব পড়েছে। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও তেজতুরী বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে বাজারে অন্তত ৯টি সবজির দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে শসার। কেজিতে ৩০ টাকা থেকে দাম বেড়ে গতকাল হাইব্রিড শসা বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। দেশি জাতের শসার দাম আরও কিছুটা বেশি। এ ছাড়া বেগুন, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, টমেটোর দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। কাঁচা পেঁপের ও মরিচের দাম ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত মাসের তুলনায় বাজারে শসার দাম ১১১ শতাংশ, কাঁচা পেঁপের দাম ৮৭ শতাংশ, দেশি টমেটোর দাম ২৫ শতাংশ ও বেগুনের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে।

গত এক সপ্তাহে পেঁয়াজের দামও কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে। তাতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। অবশ্য চলতি বছর দীর্ঘ সময় খুবই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। এতে কৃষকেরা তেমন লাভ করতে পারেননি। এখন দাম কিছুটা বাড়ায় তাঁদের মুনাফা বাড়তে পারে।

দাম বাড়ার কী কারণ

দেশে গত রোববার অনেকটা বৃষ্টি হয়। এরপর দুই দিন কিছুটা বিরতি দিয়ে মঙ্গলবার রাত থেকে আবার শুরু হয় বৃষ্টি। অবশ্য গতকাল সারা দিন রাজধানীতে বৃষ্টি হয়নি। তবে আবহাওয়া অফিস দেশজুড়ে আগামী তিন দিনও থেমে থেমে বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দুই দিন ধরে বাজারে সবজির গাড়ি কম আসছে। ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় সবজি খেতে পানি জমেছে। কৃষকেরা সবজি তুলতে পারছেন না। এ কারণে কিছু সবজির দাম বেড়েছে। তবে মাস শেষ হয়ে আসায় বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও কম বলে জানান তিনি।

এদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশেও ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। তাতে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা ও পেট্রলে ১৯ টাকা দাম বেড়েছে। এর প্রভাবও পণ্যের দামে পড়েছে।

বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকা থেকে সবজি পরিবহনে ট্রাকভাড়া পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা বেড়েছে। আর গত তিন দিনে বৃষ্টির কারণে পণ্যের সরবরাহ কম ছিল। এ দুই কারণে বাজারে সবজির দাম বাড়তি।

চড়া ব্রয়লার ও ডিমের দাম

গতকাল বাজারে ফার্মের মুরগির এক ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দরে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এ দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে। এর আগে ডিমের ডজন ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। ডিমের দাম বাড়ার পেছনেও পরিবহনভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া ডিমের কিছুটা সরবরাহসংকটও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ।

বাজারে ব্রয়লার মুরগির দামও চড়া। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। মাস দেড়েক আগে ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সোনালি মুরগির দাম অবশ্য কিছুটা কমেছে। গতকাল রাজধানীর তিনটি বাজারে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর কালারবার্ড বা হাইব্রিড সোনালি বিক্রি হয়েছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে আরও ৩০ টাকা বেশি ছিল। আর রোজার ঈদের পর ৪০০ টাকার ওপরে সোনালি বিক্রি হয়েছিল।

মোড়কজাত পোলাও চালের দাম কেজিতে আরও ১৫ টাকা বেড়েছে। তাতে এক কেজি পোলাও চালের প্যাকেটের নতুন দাম হয়েছে ১৯০ টাকা। অবশ্য বিক্রেতারা এটি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি করেন। আর আগের আনা থাকলে দাম রাখা হয় ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। খোলা পোলাও চালের দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।

বাজারে দুই সপ্তাহ আগে খোলা চিনির দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা হয়েছিল। গতকালও এ দামে চিনি বিক্রি হয়েছে। আর মোটা দানার মসুর ডালের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা হয়েছে।

সয়াবিন তেলের সরবরাহ ঠিক হয়নি

বুধবার দেশে বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়ানো হয়। বোতলজাত এক লিটার সয়াবিনের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়েছে। তাতে পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম হয়েছে সর্বোচ্চ ৯৭৫ টাকা।

বাজারে প্রায় তিন মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসংকট রয়েছে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে জানিয়ে দেশেও দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল কোম্পানিগুলো। পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহও কম ছিল। তবে এত দিন সায় না দিলেও বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম বাড়ানোর অনুমতি দেয়।

অবশ্য মূল্যবৃদ্ধির এক দিন পর বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসংকট রয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুদিবিক্রেতা হ‌ুমায়ূন কবির বলেন, দাম বাড়ানোয় দুই-তিন দিনের মধ্যে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ বাড়তে পারে। তিনটি ভোজ্যতেল কোম্পানির ডিলাররা তাঁদের এ তথ্য জানিয়েছেন।