ফরেন চেম্বার আয়োজিত উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্ব নীতি শীর্ষক সভার প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত রয়েছেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, এডিবির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান। সঞ্চালনা করেন পিডব্লিউসির কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান
ফরেন চেম্বার আয়োজিত উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্ব নীতি শীর্ষক সভার প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত রয়েছেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, এডিবির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান। সঞ্চালনা করেন পিডব্লিউসির কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান

বাংলাদেশে এনবিআর সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে: এডিবির কর্মকর্তা

বাংলাদেশে ছয়-সাতটি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা বিনিয়োগ সহজীকরণের কর্মসূচি নিয়ে আসে। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করে তা বাতিল করে দেয়। অন্য কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা নেই, যেখানে একটি সংস্থা সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।

রাজধানীর গুলশানের রেনেসাঁ হোটেলে আজ রোববার ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্বনীতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা এমন মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় চন্দন সাপকোটা বলেন, ‘এনবিআরের এমন পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসায়ের নীতির ক্ষেত্রে কী ঘটবে, তার কোনো পূর্বাভাস করা যায় না। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় বাধা। দক্ষিণ এশিয়ায় আমি পাঁচটি দেশে এডিবির জন্য কাজ করেছি। অন্য কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা নেই, যেখানে একটি সংস্থা সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।’

আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এফআইসিসিআই সভাপতি রূপালী চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। প্যানেল আলোচকদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান।

এডিবির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা বলেন, বাংলাদেশে ৫০ লাখের কম মানুষ আয়কর দেন। অন্যদিকে ছাড়ের কারণে ৬ শতাংশের মতো কর আদায় হচ্ছে না। এমন নয় যে কর আদায় কম হচ্ছে, তবে যা সংগ্রহ করা উচিত ছিল, তা হচ্ছে না। ফলে যারা আইন মেনে চলছে, তাদের ওপরই করের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, দেশের রাজস্বঘাটতি হয়তো সামলানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে রাজস্বঘাটতির সামগ্রিক গতিধারা ভালো নয়। এটি সঠিক দিকে যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

জ্যঁ পেম আরও বলেন, ‘দেশি-বিদেশি সব ক্ষেত্রেই বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। কখনো কখনো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে আমরা দেশীয় ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে কাজে লাগানোর গুরুত্ব ভুলে যাই। আমার মতে, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের দিকেও নজর দেওয়াটা সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে জরুরি বিনিয়োগ পরিবেশ ঠিক করা। বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল হলে শুধু কর প্রণোদনা দিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া যায় না।’

ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, ‘দেশে প্রত্যক্ষ কর অনেক বেশি। যাঁরা ইতিমধ্যে কর দিচ্ছেন, তাঁদের আরও বেশি কর দিতে বলা হচ্ছে। এটি একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠছে। দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ বা তার নিচে। করের আওতা বাড়ানো ছাড়া কীভাবে আপনি ১৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পেতে পারেন।’

বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও কথা বলেন রূপালী চৌধুরী। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পরিষেবা (ইউটিলিটি) মূল্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে কাজ করা কোম্পানির বেশি হতে পারে না। কিন্তু এই বৈষম্যমূলক বিধান বহাল রয়েছে। এর সমাধান করা প্রয়োজন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবছর এনবিআরকে বিশাল অঙ্কের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় এবং অর্থবছর শেষে তা অপূর্ণ থেকে যায়। এটি অনেক বছরের ধারাবাহিক চিত্র। এটি শুধু কাঠামোগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতাও।

বাজেট প্রণয়নের পদ্ধতি পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমাদের বাজেট প্রণয়নে প্রথমে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, তারপর সম্পদের সন্ধান করা হয়। এই ধারা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। মূল বিষয় হওয়া উচিত সামষ্টিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া।’

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘নতুন শিল্পকে উৎসাহিত করতে কর অব্যাহতির প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমাদের কোনো কর অব্যাহতির নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। একবার কোনো অব্যাহতি দেওয়া হলে তা চিরস্থায়ী হয়ে যায়। এই অব্যাহতিগুলো আমাদের সরকারি কোষাগার থেকে প্রচুর সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে। নতুন শিল্পকে ৫ বা ১০ বছরের জন্য অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু এ জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। সারা বিশ্বে এটিই সাধারণ রীতি।’

বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, ‘বাংলাদেশে নীতির ‘‘দ্বীপ’’ রয়েছে। এনবিআরের একধরনের নীতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্য নীতি। এসব নীতির মধ্যে আবার কোনো সমন্বয় নেই। ব্যবসা করা এখনো অনেক কঠিন। একজন নতুন উদ্যোক্তাকে ট্রেড লাইসেন্স পেতেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমরা সরকারকে বলে আসছি, ১৯৪০-এর দশকের এই ট্রেড লাইসেন্স প্রথা তুলে দেন।’

আবুল কাসেম খান আরও বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রেও আমরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি। ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করলে দেখবেন, অর্থনীতির আকার একই রকম হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার এফডিআই পাচ্ছে, যেখানে আমরা পাচ্ছি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার।’

মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশ অনেকগুলো বিষয়ে ভুল দিকে গেছে। সোজা পথ রেখে জটিল পথে এগোচ্ছে। এসব গতিপথ উল্টাতে হবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে, অর্থাৎ অর্থবছরের সপ্তম মাসে ১০০টি ভিন্ন ব্যবসা বা খাতে ভ্যাট পরিবর্তন করা হয়েছিল। সমালোচনার মুখে এর মধ্য থেকে কিছু পরে প্রত্যাহার করা হয়। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এভাবে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের পরিবর্তে স্থিতিশীলতার দিকে যেতে হবে। আর ঢালাও কর অব্যাহতির বিপরীতে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা চালু করতে হবে।