
পোশাক কারখানার ফেলে দেওয়া কাপড়ের টুকরায় ঘুরছে উত্তরের অর্থনীতির চাকা, বৈচিত্র্যময় পোশাকে সস্তার বাজারে মিলছে গুণগত মান। শত কোটি টাকার গতিশীল এই অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ বিকাশে প্রয়োজন গ্যাস ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধা।
শীতের কনকনে ঠান্ডা যখন উত্তরের জেলাগুলোতে জেঁকে বসতে শুরু করে, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটপাত থেকে শুরু করে মাঝারি বিপণিবিতানগুলোতে এক চিলতে ওমে মোড়ানো সাশ্রয়ী গরম কাপড়ের খোঁজ পড়ে। সাধারণ মানুষের এই বিপুল চাহিদার জোগান দিতে প্রতিবছর এক নীরব বিপ্লব ঘটে যায় নীলফামারীর সৈয়দপুরে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, সাভার কিংবা গাজীপুরের সুউচ্চ ও আধুনিক পোশাক কারখানাগুলোর মেঝেতে কাটিং টেবিল থেকে ঝরে পড়া যে কাপড়গুলোকে আমরা ‘ঝুট’ বা পরিত্যক্ত অবশিষ্টাংশ বলে ফেলে দিই, সেই অবহেলিত কাপড়ের টুকরাকে ঘিরেই সৈয়দপুরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক পোশাকশিল্প। ফেলে দেওয়া কাপড়কে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলার এই কর্মযজ্ঞ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে, অন্যদিকে অতি অল্প দামে সাধারণ মানুষের গায়ে আধুনিক পোশাক তুলে দিয়ে লাখো মানুষের মুখে ফুটিয়েছে হাসি। এখন এটি আর কেবল স্থানীয় কোনো কুটির শিল্প নয়, বরং উত্তরের শত কোটি টাকার এক গতিশীল অর্থনীতি।
সৈয়দপুরের রেলবাজার ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যের প্রসার পুরো শহরে। প্রতিটি অলিগলিতে ঢুকলেই কানে আসবে সেলাই মেশিনের অবিরাম ‘খট খট’ শব্দ। শহরের মুন্সীপাড়া, নয়াটোলা, হাতিখানা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের ঘরে ঘরে তাকালে দেখা যাবে একই চিত্র। টিনের চালার নিচে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কারিগরেরা।
স্থানীয় লোকজন জানান, সৈয়দপুরের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে এমন ৫০০টির বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছে, যার অধিকাংশই প্লাজা সুপার মার্কেটে। সেখানকার একটি কারখানা ‘রিজওয়ান গার্মেন্টস’–এর স্বত্বাধিকারী বা ‘মহাজন’ মোহাম্মদ মাসুদ হোসেন। তাঁর কারখানায় বছরের পর বছর ধরে কাপড় সেলাইয়ের কাজে যুক্ত আছেন দুই অভিজ্ঞ কারিগর—নওশাদ আলী ও মোহাম্মদ রুবেল। তাঁরা বলেন, ‘আমাদের এখানকার মালের কদর এখন দেশ পেরিয়ে ভিনদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ পোশাক ভারত, নেপাল ও ভুটানে যায়। সেসব দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি সৈয়দপুরে এসে ট্রাকে করে মাল নিয়ে যান।’
নওশাদ আলী জানান, এখানে তৈরি পোশাকগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা করপোরেট অর্ডারের ভিত্তিতে তৈরি হয় না, বরং তৈরি করা হয় উন্মুক্ত পাইকারি বাজারের জন্য। দেশের ভেতরের বাজারও কম বড় নয়। মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ‘শীতকাল এলে আমাদের দম ফেলার সময় থাকে না। ঢাকা, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকেই পাইকারেরা আসেন। দামে অত্যন্ত সাশ্রয়ী হওয়ায় মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের শীতের কাপড়ের বিশাল চাহিদা মেটাতে এই পোশাকগুলো সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে।’
প্রথম দর্শনে এখানকার পোশাকগুলোকে বাজারের অন্য পোশাকের থেকে আলাদা করা মুশকিল। ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি হলেও এদের ফিনিশিং এবং স্থায়িত্ব অনেক সময় বাজারের সাধারণ কাপড়ের চেয়েও এগিয়ে থাকে।
শুধু কি শীতবস্ত্র? ঋতুভেদে বদলে যায় সৈয়দপুরের কারখানার উৎপাদন তালিকা। শীতের মৌসুমে যেখানে ভারী জ্যাকেট, হুডি ও ব্লেজার তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন কারিগরেরা, সেখানেই ঈদের মৌসুমে তৈরি হয় বাহারি ডিজাইনের ডেনিম ও গ্যাবাডিনের প্যান্ট কিংবা ট্রেন্ডি শার্ট। আবার গরমের তীব্রতা বাড়লে সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য তৈরি হয় টু-কোয়ার্টার, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হাফ প্যান্ট এবং হালকা ট্রাউজার। কাপড়ের এই সুনিপুণ রিসাইকেলিং বা পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একদিকে যেমন অপচয় কমছে, অন্যদিকে অতি অল্প মূল্যে বাজারে পরিমার্জিত পোশাক সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।
তবে এই চোখধাঁধানো সাফল্যের পেছনের গল্পটি পরিশ্রমী এবং ঘামঝরানো। গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জের বৃহৎ পোশাক কারখানাগুলোতে সাধারণত আধুনিক ‘চেইন সিস্টেমে’ কাজ হয়, যেখানে একজন কর্মী কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশ সেলাই করেন। তবে সৈয়দপুরের একজন কারিগর একাই পুরো প্যান্ট বা জ্যাকেট কাটিং থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সেলাই—সবই করেন।
রাজু গার্মেন্টসের কারিগর সোহেল হাফিজ তাঁদের দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের কাজটা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা নয়। বস্তায় করে যখন ঢাকার গার্মেন্টস থেকে ঝুট কাপড় আসে, তখন তার মধ্যে বিভিন্ন রঙের ও সাইজের ছোট-বড় টুকরা মিক্স করা থাকে। সেখান থেকে রং মিলিয়ে, কাপড়ের ধরন বুঝে জোড়া মেলাতেই আমাদের প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় পার হয়ে যায়।’ সোহেল জানান, একজন দিনমজুর কারিগর সারা দিনে সর্বোচ্চ ৩০টির মতো পোশাকের কাটিং ও সেলাই করতে পারেন। সারা দিন গায়ের ঘাম ঝরিয়ে এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর তাঁদের আয় হয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
অদম্য এই কারিগরদের হাত ধরে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পের কাঁচামালেও একধরনের রূপান্তর এসেছে। নওশাদ আলী জানান, অতীতে শতভাগ ঝুট কাপড়ের ওপর নির্ভর করলেও বর্তমানে উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ রোল কাপড় এবং ৪০ শতাংশ ঝুট কাপড় ব্যবহৃত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতিকে দায়ী করেন। সিটি গার্মেন্টসের মালিক বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে যে ঝুট কাপড় আমরা ৫ থেকে ৭ টাকা কেজি কিনতাম, ঢাকার গার্মেন্টসের মালিকেরা এখন সেটির দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া দালালের হাত ঘুরে কাঁচামাল আসায় আমাদের খরচ আরও বেড়ে যায়।’ এত প্রতিকূলতার পরও তাঁরা পাইকারি পর্যায়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে একটি ফুল প্যান্ট এবং মাত্র ২০০ টাকার মধ্যে উন্নত মানের জ্যাকেট বিক্রি করতে পারেন। খুচরা বাজারে এসে এগুলো ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা দেশের খেটে খাওয়া ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এক পরম আশীর্বাদ।
এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সৈয়দপুরে বাড়িতে বাড়িতে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা। এসব কারখানায় ঝুট কাপড় থেকে পোশাক তৈরি করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে প্রায় ৫০০ পরিবার। বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং পরিবেশবান্ধব এই রিসাইকেলিং শিল্প দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখলেও সৈয়দপুরের কারিগরেরা ও মহাজনেরা প্রয়োজনমতো সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কারিগরদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভ ব্যাংকঋণ নিয়ে। আরেক কারখানার মালিক মো. জাওয়াদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের মতো ছোট কারখানার জন্য সরকারি কোনো সহজ শর্তের ঋণ বা ব্যাংকের লোন পাওয়া আকাশকুসুম কল্পনা। কোনো জরুরি সংকট বা ব্যবসায়িক মন্দা দেখা দিলে আমরা নিরুপায় হয়ে মহাজনের কাছ থেকে দাদন বা অগ্রিম টাকা নিই। পরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে সেই টাকা শোধ করতে হয়।’
ঋণের অভাবের পাশাপাশি এই অঞ্চলের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত অন্তরায় হলো গ্যাসের তীব্র সংকট। গ্যাস–সংযোগ না থাকার কারণে সৈয়দপুরে আজ পর্যন্ত কোনো আধুনিক ‘ওয়াশিং প্ল্যান্ট’ বা ডাইং কারখানা গড়ে ওঠেনি। কারিগরদের মতে, এখানে কাপড় ওয়াশ ও উন্নত ফিনিশিংয়ের সুযোগ থাকলে পোশাকগুলোর উজ্জ্বলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের তৈরি হলে বহুগুণ বেশি দামে রপ্তানি হতো।
সৈয়দপুরের এই পোশাকশিল্পের একটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। এখানকার দরজি ও কারিগরদের পেশাগত শিকড় মূলত পাকিস্তান আমল থেকে বিস্তৃত। নওশাদ ও রুবেলের পরিবার চার পুরুষ ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের দাদা নাজমুল হক দেশভাগের পর থেকেই এই দরজির কাজ শুরু করেছিলেন, এরপর তাঁদের বাবা মোহাম্মদ চান এই ব্যবসার হাল ধরেন। বর্তমানে দুই ভাই মিলে পূর্বপুরুষের সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। মোহাম্মদ রুবেল হাসিমুখে বলেন, ‘এখানে আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। এই বাণিজ্যিক কর্মব্যস্ততার সমান্তরালে অনিন্দ্যসুন্দর রূপ হলো এর অতুলনীয় সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারখানার ভেতরে কে বাঙালি আর কে অবাঙালি, সেই পরিচয় মুছে যায় সেলাই মেশিনের ছন্দে।’