দেশে ডলার-সংকট দেখা দেওয়ায় গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে ফল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরে ফল আমদানিতে ঋণসুবিধাও বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর থেকে আমদানিকারকদের নগদ টাকায় ফল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে গত কয়েক মাসে ফলের আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। আবার যেসব ফল আমদানি হচ্ছে, ডলারের বাড়তি দামের কারণে সেগুলোর আমদানি খরচও বেশি। যার কারণে বাজারে ফলের দাম বেড়েছে, কমেছে বিক্রি।
চট্টগ্রাম কাস্টমের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশি ফলের মধ্যে আপেল, কমলা, ম্যান্ডারিন (ছোট কমলা), আঙুর ও নাশপাতি আমদানি হয়েছে ৯৩ হাজার ৩৬১ টন। গত বছরের একই সময়ে এই পাঁচ ধরনের ফলের আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩০৬ টন; অর্থাৎ আমদানি নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগের ফলে গত তিন মাসে গত বছরের একই সময়ে চেয়ে ফল আমদানি কমেছে ৪৫ হাজার ৯৬৫ টন বা ৩৩ শতাংশ। উল্লিখিত পাঁচ ধরনের ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি কমেছে আপেল, কমলা ও আঙুরের। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যেখানে আপেল আমদানি হয়েছিল ৫৮ হাজার ২৪৩ টন। এবার সেখানে বিদেশ থেকে আপেল এসেছে ৩৬ হাজার ৪৩০ টন। কমলার আমদানি ৪০ হাজার ৮০৬ টন থেকে নেমে এসেছে ২৯ হাজার ৪০৫ টনে। আর ২৩ হাজার ৬৬৯ থেকে কমে আঙুর আমদানি হয়েছে ১০ হাজার ৩৮৬ টন।
রাজধানীর বাদামতলী ফলের বাজারের আমদানিকারকেরা বলছেন, ফলের আমদানি কমে যাওয়ায় তাঁদের ব্যবসাও কমে গেছে। একদিকে আমদানি কম, অন্যদিকে ডলারের কারণে ফলের দামও বেড়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ। এখন তাই মুনাফা কমিয়ে ব্যবসায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। আবার অনেক আমদানিকারক বড় ক্ষতির শঙ্কায় আমদানি বন্ধও করে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আবদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, সব মিলিয়ে বিদেশ থেকে ৪০ শতাংশের মতো ফল আমদানি কমেছে। এখন মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আপেল, ম্যান্ডারিন ও মাল্টা আসছে। চীন থেকে আসছে আঙুর।
মঙ্গলবার ঢাকার গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবাজার ও শাহবাগ এলাকায় খুচরা বাজারে আমদানি করা আপেল প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, কমলা ২৫০ থেকে ২৭০, লাল আঙুর ৪০০ থেকে ৪৫০, মাল্টা ১৮০ থেকে ২০০, নাশপাতি ২৫০ থেকে ২৮০, নাগ ফল ৩০০ থেকে ৩২০ ও আনার ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফলের দাম বাড়তি থাকায় বেচাকেনা কম বলে জানিয়েছেন এসব এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরা।
ফুলবাড়িয়ার সাইফুল ফল স্টোরের কবির মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, আগে দিনে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার ফল বেচাকেনা হতো। দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন দিনে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকার ফল বিক্রি হয়। বিদেশি ফলের দাম বেশি হওয়ায় দেশি ফলের বিক্রি বেড়েছে।
ফল আমদানিকারকেরা বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ভারত, ভুটান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মিসর, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেজুর আমদানিও বেড়েছে। বিদেশি এসব ফলের সিংহভাগ আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই।
সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিদেশি ফলের চাহিদা বেশি থাকে। কারণ, এ সময়ে দেশীয় ফলের সরবরাহ থাকে কম। আম, লিচু, তরমুজের মৌসুমে অবশ্য বিদেশি ফলকে হটিয়ে একচেটিয়া রাজত্ব চলায় দেশীয় সুস্বাদু এসব ফল।