মোটরসাইকেল
মোটরসাইকেল

৩৭৫ সিসির মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ আসছে, নতুন নীতি নিয়ে প্রশ্ন

  • মোটরসাইকেল খাতে বারবার নীতি বদল করা হয়।

  • বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে নিয়ে সংশয়ে থাকেন।

দেশে ৩৭৫ সিসির (ইঞ্জিনক্ষমতা) মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

বর্তমানে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানিতে কোনো বাধা নেই। পুরো তৈরি বা সিবিইউ অবস্থায় এই মোটরসাইকেল যেমন আমদানি করা যায়, তেমনি যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশেও তৈরি করা যায়।

দেশে ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানি নিষিদ্ধ। তবে ৫০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল দেশে তৈরির জন্য যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানি করা যায়। এখন পুরো তৈরি অবস্থায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল বিদেশ থেকে আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জন্য প্রস্তাবিত আমদানি নীতি আদেশে বলা হয়েছে, ৩৭৫ সিসির ওপরে সব ধরনের মোটরসাইকেল আমদানি নিষিদ্ধ। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক এবং আধা সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে ঊর্ধ্বসীমার এই বিধান প্রযোজ্য হবে না, অর্থাৎ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানি করা যাবে।

বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেলের সিসিসীমার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি রয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেই নীতিমালা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমদানি নীতি আদেশ চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। এ মাসের মধ্যেই আদেশ জারি হতে পারে।

মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারীরা কোম্পানিগুলো সূত্র জানিয়েছে, উচ্চসিসির মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির সুযোগ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে কয়েকটি কোম্পানি।

মোটরসাইকেল খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুরো তৈরি অবস্থায় উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ দিলে নতুন কিছু ব্র্যান্ডের সুবিধা হবে। তারা দেশে কারখানা না করেই উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল আমদানি করতে পারবে। বিদেশি ব্র্যান্ডের পরিবেশকের বাইরে কিছু আমদানিকারক কম মূল্য দেখিয়ে (আন্ডার ইনভয়েসিং) মোটরসাইকেল আমদানি করে। তারা এখন কর ফাঁকি দিয়ে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল নিয়ে আসতে পারবে।

অন্যদিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইতিমধ্যে দেশে কারখানা করা কিছু ব্র্যান্ড। তারা আমদানি করা উচ্চ সিসির মোটরসাইকেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। এসব ব্যান্ডের মোটরসাইকেল বিপণনকারীরা বলছেন, পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানি করা মোটরসাইকেল বাজারে ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের লাভ নেই। তাতে দেশে মূল্য সংযোজন ও কারখানায় কর্মসংস্থান হবে না; বরং বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বাড়বে।

অন্যদিকে আরেকটি সমস্যার কথা বলছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেটি হলো, পুলিশের কাছে এখন মোটরসাইকেল আছে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত। ফলে এর বেশি সিসির মোটরসাইকেল বাড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়বে।

মোটরসাইকেল খাতের কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স ও ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএএমএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনে ১০টির মতো কারখানা স্থাপিত হয়েছে। সুপরিচিত জাপানি ও ভারতীয় ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল এখন দেশেই উৎপাদিত হয়। কারখানা করতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা।

সরকার ২০১৮ সালের মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা করে। ওই নীতিমালা দেখে বিনিয়োগ করে কোম্পানিগুলো। যদিও বারবার মোটরসাইকেলবিষয়ক নীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে নিয়ে সংশয়ে থাকেন বলে মনে করেন তাঁদের দেশীয় অংশীদারেরা।

বাংলাদেশে হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিজয় কুমার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেলবিষয়ক নীতি প্রায়ই পরিবর্তন হয়। নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে তাঁরাও নতুন ব্র্যান্ডের উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু তারপরও তিনি নীতির চটজলদি পরিবর্তন সমর্থন করেন না।

দেশে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতার মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে তখন বলা হয়, ৩৭৫ সিসির মোটরসাইকেলের নিবন্ধন নিতে হলে, তা হতে হবে দেশে উৎপাদিত। এ সিদ্ধান্তের আড়াই বছরের কিছু বেশি সময় পর এখন উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল সিবিইউ অবস্থায় আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে মোটরসাইকেলের বাজারও মন্দা। ২০১৮ সালে করা মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। যদিও এখন বছরে ৫ লাখের কম মোটরসাইকেল বিক্রি হয়।

দেশের একটি মোটরসাইকেল বিপণনকারী কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দেশে মোটরসাইকেল কারখানা করা কেউই প্রত্যাশিত মুনাফা করতে পারছে না। এর মধ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে একেক সময় একেক নীতি নেওয়া হয়। তা–ও গুটিকয়ের স্বার্থে। অথচ নীতিমালা হওয়া উচিত পুরো খাতকে মাথায় রেখে। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।