
বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা কোনো ঝুঁকি নেন না। তাই অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সে জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
রাজধানীর বনানীতে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নিজস্ব কার্যালয়ে আজ রোববার নভেম্বর মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সভায় এ কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান। সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কামরান টি রহমান বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ী ও মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে না আনা গেলে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে না। এখন আমাদের কর-জিডিপি হয়তো বিশ্বের সবেচেয় কম। এটি বাড়াতে করের আওতা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে ঠিকই; কিন্তু দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ মন্থর হয়ে গেছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ ও অত্যন্ত নিম্ন হারের কর-জিডিপি অনুপাত—এই বিষয়গুলোকে অর্থনীতির সংকট হিসেবে চিহ্নিত।
মূল প্রবন্ধে আশিকুর রহমান বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। তাই পরবর্তী সরকারকে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে বনের হরিণের মতো সতর্ক থাকতে হবে। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাপনা ও সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।
খেলাপি ঋণ নিয়ে আশিকুর রহমান বলেন, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিয়ে প্রবৃদ্ধির দিকে যাওয়া যাবে না। এতে সুদহার বেশি থাকবে, বিনিয়োগ কম হবে। ফলে প্রবৃদ্ধি মন্থর থাকবে। তাই কিছু খেলাপি ঋণ অবলোপন করতে হবে। নতুন সম্মিলিত ব্যাংক থেকেই এটা শুরু করতে হবে। আর বন্ড মার্কটে শক্তিশালী না করলে ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা কমানো যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ বৃদ্ধির জন্য ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে জানিয়ে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, এটার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। হয়তো এটি টাকার অতিমূল্যায়ন থামাতে করা হয়েছে। তবে বাজারভিত্তিক মুদ্রানীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এটি নিয়ে ভাবা উচিত।
দেশে এখন আমদানি বাড়ানো উচিত মন্তব্য করে জাইদি সাত্তার বলেন, ‘গত পাঁচ মাসে আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ। তবে এটা আরও বাড়াতে হবে। কারণ, আমাদের মতো দেশে আমদানিও অর্থনীতির বড় চালক।’
সভায় আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে খেলাপি হওয়ার সময় ৬ থেকে কমিয়ে ৩ মাস করা হয়েছে। এ পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিক সময়েই খেলাপির হার ২ থেকে ৩ গুণ বাড়ার কথা। এ কারণে হাজারো ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। কঠিন সময়ে ঋণ না পেলেও খেলাপি হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়। এখন অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে আছে; অর্থাৎ এসব ব্যাংক ভবিষ্যতে ঋণ দিতে পারবে না।
পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকার বলেন, ‘বেকারত্বের সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, আমরা আইএলওর পদ্ধতিতে হিসাব করছি। যেখানে সাত দিনে এ ঘণ্টা কাজ করলেই কর্মজীবী মনে করা হয়।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার আমলাতন্ত্র নয়; বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বে হওয়া উচিত বলে মত দেন সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আয়করের মাধ্যমে বেশি রাজস্ব আয়ের কথা থাকলেও বেশি আয় আসছে ভ্যাট থেকে। তাই বৈষম্য কমছে না। টাকা ছাড়া এনবিআরে কেউ সেবা দেয় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সদস্য, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।