জ্বালানিসংকটে মোটরসাইকেল বিক্রির গতি কমেছে

  • কাঁচামালের দাম এবং পরিবহন ও এলসির খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।

  • মোটরসাইকেল সার্ভিসিং সেবার চাহিদা কমেছে ২০%-২৫%।

  • নববর্ষ ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিক্রি বৃদ্ধির আশা ব্যবসায়ীদের।

দেশে সাধারণত ঈদ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়ে থাকে। এ সময় অধিকাংশ ব্র্যান্ড বিশেষ ছাড় ও ক্যাশব্যাক সুবিধা দেয়। আর এ রকম সময়ে মোটরসাইকেল কেনার চাহিদাও বাড়ে। তবে এবারে কিছু ব্যতিক্রম দেখা গেছে।

গত বছরের তুলনায় এবারে রোজার ঈদ উপলক্ষে মোটরসাইকেল বিক্রি কমেছে ৮ শতাংশ। তবে চলতি এপ্রিল মাসে বিক্রি ৪০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি বিক্রেতাদের।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। তাই অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সাশ্রয়ে যানবাহনের জন্য তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দেয়। জ্বালানিসংকটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি নিতে হয় মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকদের।

মোটরসাইকেল বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, বিক্রি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ জ্বালানিসংকট। এর ওপর মোটরসাইকেল আমদানিতে পরিবহন এবং এলসির খরচ দুটোই বৃদ্ধি পায়।

খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল ৫৬ হাজার ৪৮৬টি। চলতি ২০২৬ সালেও মার্চে ঈদ হয়। এ মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৮টি, যা গত বছরের চেয়ে ৪ হাজার ৫২৮টি বা ৮ শতাংশ কম।

২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক জানুয়ারি-মার্চে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার। এবারে একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজারটি। এক বছরের ব্যবধানে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ১৩ হাজার বা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।

জানতে চাইলে ইয়ামাহার বিজনেস ম্যানেজার হোসেন মোহাম্মদ অপশন প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেল একটি প্রয়োজনীয় বাহন। তাই মোটরসাইকেল বিক্রি আপাতত কিছুটা কমলেও জ্বালানিসংকট কমলে তা আবারও বেড়ে যাবে।

দেশে হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদন করে এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড, আর এটি বাজারজাত করে নিলয় মোটরস লিমিটেড। এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব ও নিলয় মোটরস লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) বিজয় কুমার মণ্ডল বলেন, ‘ঢাকার বাইরে রংপুর, যশোর, বগুড়া ও চট্টগ্রাম—এই চার জেলায় হিরো ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। জ্বালানিসংকটে এসব জেলায় বিক্রি ২-১৫ শতাংশ কমেছে। সংকট না কাটলে এপ্রিল মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি ১০-১৫ শতাংশ কমতে পারে।’

স্বাভাবিক সময়ে মোটরসাইকেল কেনার পর বিক্রয়কেন্দ্র থেকে দুই থেকে তিন লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল দেওয়া হয়। তবে ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানিসংকটের কারণে পটে করে তেল দিচ্ছে না। ফলে অনুমতি থাকলেও মোটরসাইকেল বিক্রেতারা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর সঙ্গে কমেছে সার্ভিসিং সেবা নিতে আসা মোটরসাইকেলের সংখ্যাও।

মোটরসাইকেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, দেশের অধিকাংশ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড তাদের সার্ভিসিং সেবার অর্থ দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটায়। এ ছাড়া সার্ভিসিং সেবা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বিক্রিও কমেছে। সব মিলিয়ে মোটরসাইকেল সার্ভিসিং সেবার চাহিদা কমেছে ২০-২৫ শতাংশ।

হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হোন্ডা লিমিটেডের (বিএইচএল) প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেন, ‘সার্ভিসিং সেবা কমে যাওয়ার অর্থ হলো মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমেছে। ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও আপাতত অনেকেই জ্বালানিসংকটের কথা ভেবে অপেক্ষা করছেন। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মোটরসাইকেল বিক্রি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ শতাংশ কমেছে।’

সরেজমিনে যা দেখা যায়

সরেজমিনে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় অধিকাংশ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাদের খুব বেশি ভিড় নেই। তবে কেউ কেউ মোটরসাইকেল দেখতে আসছেন। কেউ রেজিস্ট্রেশন কাজসহ বিভিন্ন সেবা নিতে আসছেন। অনেকেই আসেন সার্ভিসিং সেবা নিতে।

মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড হিরোর তেজগাঁওয়ের ফ্ল্যাগশিপ বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে জানা যায়, তাদের দিনে ১২-১৫টি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। এবারের ঈদে বিক্রি ১০টির নিচে নেমে আসে। এ ছাড়া আগে যেখানে প্রতিদিন ১৫০টির বেশি মোটরসাইকেল সার্ভিসিং হতো, সেখানে এখন তা কমে ১০০টির নিচে নেমে গেছে।

হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী নিলয় মোটরস লিমিটেডের রিটেইল ইনচার্জ শেখ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এপ্রিল মাস থেকে মোটরসাইকেলের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া নতুন বাইক বিক্রির পর ক্রেতাদের ফিলিং স্টেশনে যাওয়ার জন্যও পর্যাপ্ত জ্বালানি দিতে পারছি না।’

হিরোর এই বিক্রয়কেন্দ্রে বেসরকারি চাকরিজীবী অমিতাভ হালদারের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। বোনের জন্য একটি স্কুটি দেখতে আসার তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যাঁরা ছোটখাটো চাকরি করি, তাঁদের জন্য মোটরসাইকেল একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহন। জ্বালানি না পাওয়া কিংবা দাম বেড়ে গেলেও মোটরসাইকেল ব্যবহার তো আর বন্ধ করা যাবে না।’

দেশে ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের আনুষ্ঠানিক পরিবেশক এসিআই মোটরস। তাদের তেজগাঁওয়ের ফ্ল্যাগশিপ বিক্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১৫টি মডেলের মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। বিক্রয়কেন্দ্রটিতে ক্রেতার উপস্থিতি কমই দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে প্রতিদিন গড়ে ১৫টির মতো মোটরসাইকেল বিক্রি করত, যা এখন ৮-১০টিতে নেমে এসেছে।

এই বিক্রয়কেন্দ্রের বিপণন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানিসংকট শুরুর দিকে বিক্রি কমে গিয়েছিল। এখন অবশ্য বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।’