
‘রানা প্লাজা ধসে হাত হারিয়েছি। শুধু আমি না, আমার মতো আরও অনেকে হাত–পা হারিয়েছেন। অথচ ১৩ বছর পার হলেও আমরা এখনো এই ঘটনার উপযুক্ত বিচার, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা পাইনি। রানা প্লাজা ধসের আগে আমি মাস্টার্স পাস করেছিলাম। কী লাভ হলো মাস্টার্স পাস করে? হাত হারিয়ে এখনো কর্মহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি।’ —রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পর এসে এভাবেই নিজের আকুতি ও অসহায়ত্ব তুলে ধরেন ওই ঘটনায় আহত সাদ্দাম হোসেন।
একই ঘটনায় আহত শ্রমিক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, রানা প্লাজার আহত ও নিহত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার কেমনে জীবনযাপন করছে, কেউ এখন আর তার খোঁজ রাখে না। শ্রমিকেরা আজও রাস্তায় রাস্তায় কেঁদে বেড়াচ্ছেন, আর কত কাঁদবেন, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি জাতির সামনে।
আজ বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় এভাবেই নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন রানা প্লাজা ধসে আহত এই দুই শ্রমিক। ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ১৩ বছর: বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম। সভাটি সঞ্চালনা করেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার নথিপত্রের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৫ জন নিহত হন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমদ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক বিশ্বজিৎ রায়, শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মেজবাউদ্দিন আহমেদ, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম সমন্বয়কারী এ এস এম ফয়েজ হোসেন ও শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের সদস্যসচিব সেকেন্দার আলী। সভার শুরুতে রানা প্লাজা ধসে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সভায় বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কলকারখানায় এই যে আগুন লাগছে বা হত্যাকাণ্ড ঘটছে, এগুলো শুধু দুর্ঘটনা নয়; বরং অবহেলাজনিত এবং অবজ্ঞাজনিত হত্যাকাণ্ড। আমাদের শুধু ঢাকায় বসে আলোচনা করলে হবে না, শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য এলাকাভিত্তিক আন্দোলন শুরু করতে হবে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে শ্রমিকদের এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে নিরাপত্তা আমাদের অধিকার।’
সভাপতির বক্তব্যে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, মুনাফালোভী মালিকদের কারণে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটেছে। ভবনে ত্রুটি জানা সত্ত্বেও শ্রমিকদের কাজ করতে হয়েছে। কারণ, শ্রমিকদের শক্তি তখন দুর্বল ছিল। শ্রমিকেরা সংগঠিত থাকলে হয়তো এই ঘটনা এড়ানো যেত। তাই শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে আরও বেশি সোচ্চার ও সচেতন হতে হবে।
সভায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক বিশ্বজিৎ রায় বলেন, এত কম লোকবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক কারখানা তদারক করা প্রায় অসম্ভব। এ ছাড়া শ্রম অধিদপ্তরের বড় অংশের সময় ব্যয় হয় শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও পাওনা আদায়ে। ফলে নিরাপত্তা তদারকি অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন তাজরীন ফ্যাশনস দুর্ঘটনায় আহত জরিনা আক্তার, হাশেম ফুডসের দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারের সদস্য লিপি আক্তার ও সম্প্রতি ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলীর গ্যাসলাইট কারখানায় আহত মরিয়ম বেগমসহ বিভিন্ন কারখানায় দুঘর্টনায় আহত শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।