এফবিসিসিআই
এফবিসিসিআই

এফবিসিসিআই এখন অভিভাবকশূন্য

টানা ২১ মাস দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব নেই। এত দিন ধরে প্রশাসক দিয়ে চলেছে সংগঠনটির দৈনন্দিন কাজ। তবে দুই সপ্তাহ ধরে প্রশাসক পদেও কেউ নেই। গত মাসের শেষ সপ্তাহে বিদায়ী প্রশাসকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কাউকে ওই পদে নিয়োগ দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে এখন পুরোপুরি অভিভাবকশূন্য অবস্থায় আছে এফবিসিসিআই।

অন্যদিকে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের প্রক্রিয়াও থমকে আছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যবসায়ী সংগঠনের আপত্তির মুখে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কাজটি শেষ করেনি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিলেও গত পাঁচ মাসে এই বিধিমালা সংশোধন হয়নি। এতে করে এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন চেম্বারের নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট হচ্ছে না।

দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সরকার বেসরকারি খাতের ব্যবসা–বাণিজ্য চাঙা করতে নীতিসহায়তা থেকে শুরু করে প্রণোদনা তহবিল চালুর মতো উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনসহ অন্যান্য বাণিজ্য সংগঠনকে সক্রিয় করার আন্তরিক কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ছে না। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধন না করা পর্যন্ত ব্যবসায়ী সংগঠনের বর্তমান সংকটের সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।

জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহায়ক কমিটির সদস্য আবুল কাশেম হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। অথচ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যবসায়ী সংগঠনে আজ প্রায় দুই বছর কোনো নেতৃত্ব নেই। অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকার এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করছেন না। সরকার যদি প্রয়োজন মনে না করে তাহলে এফবিসিসিআই বিলুপ্ত করে দিক।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগের দাবিতে তৎপর হয় সংগঠনটির সদস্যদের একাংশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সভাপতি পদ থেকে মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন। পরে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ফেডারেশনের পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. হাফিজুর রহমানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বেসরকারি খাত থেকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক নিয়োগ করার জন্য একজন যোগ্য বেবসায়ী খোঁজা হচ্ছে। তাঁর অধীনেই নির্বাচন হবে
মো. আতাউর রহমান খান, বাণিজ্যসচিব

প্রশাসক হিসেবে হাফিজুর রহমান এক বছর দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর মেয়াদে নির্বাচন দিয়ে যেতে পারেননি। তবে তাঁর মেয়াদে তফসিল ঘোষণা করা হয়। তফসিল ঘোষণার পর একাধিক ব্যবসায়ী বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার বিভিন্ন ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করেন। এতে নির্বাচন আটকে যায়। হাফিজুর রহমানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেড় মাস প্রশাসক পদ শূন্য ছিল। এরপর গত বছরের অক্টোবরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তাঁকে ১২০ দিন বা ৪ মাসের মধ্যে নির্বাচন করে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে বলা হয়। তবে মামলার কারণে তিনিও নির্বাচন দিতে পারেননি। গত ফেব্রুয়ারিতে আবদুর রহিম খানের মেয়াদ আরও চার মাস বাড়ানো হয়, যা গত ২৬ জুন শেষ হয়েছে। ওই দিন এফবিসিসিআইয়ে শেষবারের মতো অফিস করেন আবদুর রহিম খান।

গত মে মাসে এফবিসিআইয়ের সদস্যদের একাংশের জোট ‘এফবিসিসিআই সংস্কার পরিষদ’ নেতারা ব্যবসায়ী প্রশাসক নিয়োগসহ বিভিন্ন দাবিতে তৎকালীন প্রশাসক আবদুর রহিম খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। তখন আবদুর রহিম খান বাণিজ্যসচিবের চলতি দায়িত্বও পালন করছিলেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তার পরিবর্তে বেসরকারি খাতের একজন ব্যবসায়ীকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। আবদুর রহিম খান বদলি হয়ে বর্তমানে শ্রম মন্ত্রণালয়ে আছেন।

জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমি আর এফবিসিসিআইয়ে যাচ্ছি না। আমার মেয়াদকালে একজন ব্যবসায়ীকে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি আর চূড়ান্ত হয়নি।’

এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি খাত থেকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক নিয়োগ করার জন্য একজন যোগ্য বেবসায়ী খোঁজা হচ্ছে। তাঁর অধীনেই নির্বাচন হবে।

গত বছরের মে মাসে বাণিজ্য সংগঠনের নতুন বিধিমালা জারি করে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। তার দুই সপ্তাহের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনী বোর্ড গঠন করা হয়। গত বছরের ১৮ জুন ঘোষিত তফসিলে উল্লেখ করা হয়, ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর সরাসরি ভোটে সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, ২ জন সহসভাপতি ও ৩০ জন পরিচালক নির্বাচিত হবে। পরে বাণিজ্য সংগঠনের দাবির মুখে নির্বাচনের সময় ৪৫ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বিধিমালা অনুযায়ী, ফেডারেশনের পরিচালনা পর্ষদে টানা দুবারের বেশি দায়িত্ব পালন করা যাবে না। তবে দুবার দায়িত্ব পালনের পর একবার বিরতি দিয়ে আবার নির্বাচন করা যাবে। এই নিয়ম ভবিষ্যতের পাশাপাশি বিগত সময়ের জন্যও প্রযোজ্য করা হয়। বিধিমালার এই বিধান নির্বাচনী তফসিলেও রাখা হয়েছিল। এতে সর্বশেষ গত দুই পর্ষদে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। এতে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়। ক্ষুব্ধ একাধিক ব্যবসায়ী এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন। এরপর নির্বাচনপ্রক্রিয়া থমকে যায়।

এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠনের আপত্তির মুখে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত সেপ্টেম্বরে বিধিমালা সংশোধনের বিষয়ে একটি বৈঠক করার পর প্রক্রিয়াটি শ্লথ হয়ে যায়। আর এই বিধিমালা সংশোধন না হওয়ায় এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি অনেক চেম্বারের নির্বাচনও আটকে আছে।

জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনকে সচল করা দরকার। তা না হলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থসংশিষ্ট বিষয়গুলো সরকারের কাছে পৌঁছাতে পারবেন না।