
ঐতিহ্যবাহী নকশা ও কারুকাজে তৈরি এক জামদানি শাড়ির দাম হাঁকা হচ্ছে দেড় লাখ টাকা। বিক্রেতারা এই শাড়ির নাম রেখেছেন ‘নিখুঁত’। শাড়িটি তৈরি করতে দুজন দক্ষ কারিগরের প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছে। নীল রঙের জমিনের এই জামদানিতে লাল রঙের পাড় ব্যবহার করা হয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন শাড়িটির নকশাকে স্থানীয় ভাষায় ‘কোনার জাল’ নকশা। জামদানিটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভা এলাকার তাঁতে বোনা হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর খামারবাড়ি রোডের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত জামদানি ও কারুপণ্য মেলায় এই শাড়ি নিয়ে এসেছে জামদানি উইভিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চার দিনব্যাপী এই মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সব মিলিয়ে মেলায় ২০টির বেশি জামদানি শাড়ির স্টল রয়েছে।
জামদানি উইভিং স্বত্বাধিকারী জাহিদ হাসান জানান, সূক্ষ্ম কারুকাজ ও দীর্ঘ সময়ের শ্রম এই শাড়ির উচ্চমূল্যের প্রধান কারণ। এ ছাড়া এই শাড়ি ২০০ কাউন্টের খাদি সুতা দিয়ে তৈরি হয়েছে। কারিগর ও সুতা বাবদ প্রায় এই শাড়ি তৈরিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর চেয়েও দামি জামদানি শাড়ি তৈরি হয়। সে জন্য আমাদের কাছে অর্ডার দিতে হয়।
মেলায় অংশ নিয়েছে আরেকটি জামদানি শাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আল আমিন জামদানি। মেলায় এই প্রতিষ্ঠান কয়েক শ রং ও নকশার জামদানি শাড়ি এনেছেন। মেলায় তাদের এক লাখ টাকার একটি জামদানি শাড়ি রয়েছে। ম্যাজেন্টা বা গাঢ় গোলাপি রঙের এই শাড়ির নকশায় রয়েছে ‘তিন লতার জাল’ ও ‘হারিকেন ফুল’। এ ছাড়া পাড়ে রয়েছে গাছের নকশা। শাড়ি তৈরিতে তিন মাস সময় লেগেছে। শাড়িটি ৮৪ কাউন্টের সুতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। শাড়িটি তৈরিতে ৫০ শতাংশ সুতা ও বাকি ৫০ শতাংশ সিল্ক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
আল আমিন জামদানির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ রাসেল বলেন, এই শাড়ি তৈরিতে ২ হাজার টাকার সুতা লেগেছে। আর প্রধান কারিগরকে দিতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এ ছাড়া যিনি এই সুতা বোনেন তাঁকে দিতে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া আরও নানা কাজে ৫ হাজার টাকার খরচ রয়েছে। এই শাড়ি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার করা যায়।
মেলায় অংশ নেওয়া জামদানি শাড়ির ব্যবসায়ীরা জানান, মেলায় আসা বেশির ভাগ বিক্রেতাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার। সেখানকার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁরা শাড়ি এনে অথবা নিজে তৈরি করে এই মেলায় জামদানি শাড়ি নিয়ে এসেছেন। মেলায় প্রায় ১০০টির বেশি রঙের এবং ৫০০টির বেশি নকশার জামদানি শাড়ি রয়েছে। দামেও রয়েছে ভিন্নতা। এখানে সর্বনিম্ন প্রায় ৫ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দামের জামদানি শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে।
মেলায় আরও যা আছে
মেলায় সব মিলিয়ে মোট ১০০টি স্টল অংশ নিয়েছে। মেলাটি সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। মেলায় বিভিন্ন নকশা করা শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি রয়েছে। এসব শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে দেড় হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে। মেলায় এমন এক প্রতিষ্ঠান ত্রিমাত্রিক। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন ডলি রানী দাস। মূলত তিনি নিজেই পণ্যের নকশা করেন।
ডলি রানী দাস বলেন, মেলায় ১০০ ধরনের শাড়ি এনেছি। এর প্রতিটি আলাদা নকশা। এসব শাড়ির দাম দুই থেকে চার হাজার টাকা।
মেলায় অংশ নেওয়া হ্যান্ডিক্রাফট প্রতিষ্ঠান এইচ এ এস হ্যান্ডিক্রাফট। এই প্রতিষ্ঠানের স্টলে রয়েছে ফ্লোর ম্যাট, শতরঞ্জি, কার্পেট, ওয়াল ম্যাট, টেবিল ম্যাট ও পাপোস। এই স্টলে ওয়াল ম্যাটের দাম দেড় হাজার টাকা থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া পাপোশ রয়েছে ১০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে। মূলত পাট, স্যানেল সুতা (একধরনের নরম ও মখমলজাতীয় সুতা) ও অ্যাম্বুশ সুতার তৈরি হয় এসব পণ্য।
আরেক প্রতিষ্ঠান ভূঁইয়া হস্তশিল্প মেলায় অংশ নিয়েছে তাদের পাট ও হোগলার তৈরি পণ্য নিয়ে। পাট দিয়ে টেবিল রানার, ফুলের তোড়া ও ফ্লোর ম্যাট রয়েছে। আর হোগলার তৈরি নার্সারি পটসহ রয়েছে প্রায় ৫০ ধরনের পণ্য।
আরেক প্রতিষ্ঠান রংধনু হ্যান্ডিক্রাফটে রয়েছে পাটের তৈরি লাঞ্চ, শপিং ও ট্র্যাভেলের জন্য বিভিন্ন আকৃতির ব্যাগ। এসব ব্যাগের দাম ১৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
মেলায় আরও রয়েছে আচার, মধুসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য। আরও রয়েছে বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি পণ্য।