স্পিনিং মিল
স্পিনিং মিল

বস্ত্র খাত

দেশি সুতাকল ধুঁকছে কেন

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে লিটল গ্রুপের ইন্টিমেট স্পিনিং মিলের দিনে ৮ হাজার ৫০০ পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। চাহিদা কম থাকায় অনেক দিন ধরে চার হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদিত হচ্ছে কলটিতে। সেই সুতাও বিক্রি হচ্ছে না। বর্তমানে কারখানাটির গুদামে প্রায় ৪৭ দিনের উৎপাদিত ১ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড সুতা মজুত আছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।

দেশে শাড়ি ও লুঙ্গি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছোট–বড় মিলে সুতা সরবরাহ করে ইন্টিমেট স্পিনিং মিল। রোজার ঈদের আগে সুতার চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিনের উৎপাদিত সুতা প্রতিদিন বিক্রি হয়ে যায়। এমন তথ্য দিয়ে লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, বন্ডের আওতায় আমদানি হওয়া প্রচুর পরিমাণ সুতা কম দামে স্থানীয় বাজারে চলে যাচ্ছে। সে কারণে দেশি মিলগুলোর সুতা বিক্রি ব্যাপক হারে কমে গেছে। তাই আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

রূপগঞ্জের এই কারখানার মতো দেশের বাজার কিংবা রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সুতা সরবরাহকারী স্পিনিং মিল বা সুতার কলগুলো সংকটে পড়েছে। তার কারণ ভারতসহ অন্য দেশের স্পিনিং মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না দেশের সুতাকলগুলো। তাতে সুতা আমদানি বাড়ছে আর দেশের মিলের গুদামে জমছে দেশে উৎপাদিত সুতার স্তূপ।

বস্ত্র খাতের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বিভিন্ন কারণে দেশের স্পিনিং মিলগুলো ধুঁকছে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়া, বিদ্যুতের লোডশেডিং, দেশের সুতা ব্যবহারে প্রণোদনা হ্রাস ও ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে স্পিনিং মিলের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা পাওয়ায় দেশটির ব্যবসায়ীরা কম দামে সুতা বিক্রি করতে পারছে। এ জন্য তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় পার্শ্ববর্তী দেশটি থেকে সুতা আমদানি বাড়িয়েছে। আবার বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতাও বেআইনিভাবে স্থানীয় বাজারে চলে যাচ্ছে। ফলে দেশের সুতাকলে উৎপাদিত সুতা বিক্রি কমে গেছে। মিলগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৪০-৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করতে পারছে না।

ক্রয়াদেশ না থাকার কারণে স্পিনিং মিলগুলো ৪০-৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতায় চলছে। তারপরও গুদামে পণ্য জমছে। প্রায় সবারই একই অবস্থা। ভারতের মিলগুলো আমাদের চেয়ে প্রতি কেজি সুতা ৩৫-৪০ সেন্ট কম দামে বিক্রি করছে।
রাজীব হায়দার, সাবেক পরিচালক, বিটিএমএ

ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ গত মাসে ১০-৩০ কাউন্টের ব্লেন্ডেড সুতা আমদানিতে ২০ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপ অথবা বন্ডের মাধ্যমে সুতা আমদানি বন্ধ অথবা নগদ সহায়তার দাবি জানায়। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তারা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেয়। তবে সুতার বড় ব্যবহারকারী তৈরি পোশাক খাতের কারখানামালিকদের দুই সংগঠন—বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তার বিরোধিতা করে। তাতে কটন সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের উদ্যোগটি আপাতত শ্লথ হয়ে গেছে।

বিটিএমইএ গত মাসে সংবাদ সম্মেলন করে হুমকি দেয়, আমদানি সুতায় শুল্কারোপ কিংবা নগদ সহায়তা না দিলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব বস্ত্রকল বন্ধ থাকবে। তারপর গত ২৭ জানুয়ারি বিটিএমএ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। সেই বৈঠক তিনি অবহিত করেন, সুতাকলের সমস্যা সমাধানে সরকার বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার অর্থ বিভাগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক হবে। তারপর বস্ত্রকল বন্ধ রাখার কর্মসূচি স্থগতি করেন বিটিএমইএর নেতারা।

সংকটের পেছনের কারণ

দেশে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫২৬। তার মধ্যে কিছু মিল বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ভারতসহ অন্য দেশ থেকে কটন সুতা আমদানি গত দুই অর্থবছরে টানা বেড়েছে। ধুঁকতে থাকা দেশীয় সুতার কলগুলো বাঁচাতে গত বছর বিটিএমএর নেতারা অভিযোগ করেন, স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানিতে অনিয়ম হচ্ছে। তাঁদের অনুরোধে গত এপ্রিলে ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ সরকার। এখন শুধু সমুদ্রপথে সুতা আনা যায়। তার পরও ভারত থেকে সুতা আমদানি খুব একটা কমেনি। তাই তাঁরা বন্ড–সুবিধার আওতায় সুতা আমদানি বন্ধ কিংবা প্রণোদনার দাবিতে সোচ্চার হন।

এদিকে বাংলাদেশের পদক্ষেপের পর স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ দিয়েছে ভারত। গত ১৭ মে ও ২৭ জুন দুই দফায় পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা-সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিকের পণ্য ও কাঠের আসবাব রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তৃতীয় দফায় ১১ আগস্ট আরও কিছুসংখ্যক পাটপণ্যে বিধিনিষেধ দেয় দেশটি। শুধু তা–ই নয় বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানির ওপর কাউন্টারভেলিং ডিউটি বা প্রতিকারমূলক শুল্ক বসাতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটি।

বর্তমানে প্রতি কেজি ভারতীয় সুতার দাম ২ ডলার ৮৫ সেন্ট। আর দেশি সুতার দাম ৩ ডলার ১৫ সেন্ট। ফলে কিছু প্রণোদনা পেলেই আমরা দেশের স্পিনিং মিলের সুতা কিনতে পারব। অতীতেও বাংলাদেশের সুতার দাম ১৫ থেকে ২০ সেন্ট বেশি ছিল।
ফজলে শামীম এহসান, নির্বাহী সভাপতি, বিকেএমইএ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৩৫ কোটি কেজি কটন সুতা আমদানি হয়। পরের বছর সুতা আমদানি বেড়ে হয় ৫৯ কোটি কেজি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুতা আমদানি সাড়ে ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে আমদানি হয়েছে ৭০ কোটি কেজি সুতা।

সুতা উৎপাদনে মূল কাঁচামাল তুলা ও জ্বালানি। কয়েক বছর ধরে গ্যাস–সংকটে ভুগছে সুতাকলগুলো। ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউনিটপ্রতি গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করে সরকার। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে দাম আরও ৭৫ পয়সা বাড়ে। সে সময় বস্ত্রকল মালিকেরা বলেছিলেন, প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে গ্যাসের খরচ ২৫ সেন্ট থেকে বেড়ে ৪৯ সেন্ট হবে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় সুতা আমদানি বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা।

দেশি বস্ত্রকলকে সুরক্ষা দিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রণোদনা দিয়ে আসছিল সরকার; কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা বা এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কারণ দেখিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি দেশি সুতা ও কাপড় ব্যবহারে নগদ প্রণোদনা ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করে। ওই বছরের জুলাইয়ে সেই প্রণোদনা আরও কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল। তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও প্রণোদনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন স্পিনিং মিলের মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ২০২২ সালে নিট পোশাকে অপচয়ের সর্বোচ্চ হার ৩২ শতাংশ করা হয়। তার মানে পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সুতা বা কাপড় শুল্কমুক্ত সুবিধায় ৩২ শতাংশ বেশি আমদানি করতে পারবে কারখানাগুলো। তারপর থেকেই মূলত সুতা আমদানি বেড়েছে। এমনকি বন্ডের আওতায় আনা আমদানি হওয়া সুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রিও হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিটিএমএর সাবেক পরিচালক রাজীব হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্রয়াদেশ না থাকার কারণে স্পিনিং মিলগুলো ৪০-৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতায় চলছে। তারপরও গুদামে পণ্য জমছে। প্রায় সবারই একই অবস্থা। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতীয় স্পিনিং মিলগুলো আমাদের চেয়ে প্রতি কেজি সুতা ৩৫-৪০ সেন্ট কম দামে বিক্রি করছে। দেশটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী দেশ। নিজেরা নিজেদের দেশে স্পিনিং মিলের যন্ত্রপাতি তৈরি করে। বস্ত্র খাতের জন্য তাদের সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা আছে। এমন অবস্থায় আলাদা করে প্রণোদনা না পেলে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।’

সমাধান কী

দেশি সুতার বড় ব্যবহারকারী হচ্ছে নিট পোশাক কারখানা। দাম কম হওয়ায় ভারত থেকে বন্ডের আওতায় এ কারখানাগুলোই সুতা আমদানি করছে। শুল্কমুক্ত–সুবিধায় সুতা আমদানি বন্ধ হলে তৈরি পোশাক রপ্তানি ক্ষতির মুখে পড়বে, এমন দাবি করছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি কেজি ভারতীয় সুতার দাম ২ ডলার ৮৫ সেন্ট। আর দেশি সুতার দাম ৩ ডলার ১৫ সেন্ট। ফলে কিছু প্রণোদনা পেলেই আমরা দেশের স্পিনিং মিলের সুতা কিনতে পারব। অতীতেও বাংলাদেশের সুতার দাম ১৫ থেকে ২০ সেন্ট বেশি ছিল। এলডিসি উত্তরণের পর দীর্ঘ মেয়াদে বস্ত্র খাতকে কীভাবে প্রণোদনা দেওয়া যায়, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। তবে প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা দিলে সমস্যার সমাধান হয়।’