
গাজীপুরের মৌচাক এলাকায় সাদামা ফ্যাশনওয়্যার কারখানার ডাইং (কাপড় রং) ইউনিটে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দৈত্যকার ডাইং মেশিনগুলো অলস পড়ে আছে। কোনো উৎপাদন নেই। নেই শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা। স্বাভাবিক সময়ে কারখানাটিতে প্রতিদিন ৪০ টন কাপড় ডাইং করানো হয়। গ্যাস না থাকার কারণে ডাইংয়ের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা কয়েক টন ভেজা কাপড় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেই কাপড় শুকানোর কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর সাদামা ফ্যাশনওয়্যারের কারখানায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এই কারখানার মতো গাজীপুর জেলার গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কিছু কারখানায় কোনো উৎপাদনই হচ্ছে না।
সাদামা ফ্যাশনওয়্যারের মহাব্যবস্থাপক মঈনুল ইসলাম বললেন, গ্যাস-সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে কাপড় ডাইং করা যাচ্ছে না। গত রোববার কয়েক ঘণ্টা গ্যাসের চাপ ভালো থাকলেও তার পর থেকে চাপ দিনরাত সব সময় ১ পিএসআইয়ের কম থাকছে। জেনারেটরের মাধ্যমে যেটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, তা দিয়ে কোনোরকমে সুইং সেকশন চালানো হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে সেখানেও মাঝেমধ্যে সমস্যা হয়।
তৈরি পোশাক উৎপাদনের কাপড় ডাইং ১৫ দিন আগে করতে হয়। গ্যাস-সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে ডাইং ইউনিট চলছে না।মঈনুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক, সাদামা ফ্যাশনওয়্যার
মঈনুল ইসলাম জানালেন, তৈরি পোশাক উৎপাদনের কাপড় ডাইং ১৫ দিন আগে করতে হয়। গ্যাস-সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে ডাইং ইউনিট চলছে না। এভাবে আর কয়েক দিন চললে সুইং সেকশনে কাপড় সরবরাহ করা যাবে না। তখন ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিলের মতো ঘটনা বাড়বে।
শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। কবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, কেউ বলতে পারছেন না। গ্যাস-সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোকসান বাড়ছে। সব মিলিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে প্রায় এক মাস ধরে দেশের শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। গত শনিবার গ্যাস সরবরাহ বাড়লে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করে। এলএনজি সরবরাহের টার্মিনাল সামিট পুরোদমে ও এক্সিলারেট এনার্জি আংশিক চালু হয়। তবে সংকট পুরোপুরি কাটার আগেই আবার পরিস্থিতি খারাপ হয়। তিন দিন ধরে সরবরাহ কমার পর গত বুধবার কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সংকট বেড়েছে।
গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার তুসুকা গ্রুপের কারখানায় গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকেরা উৎপাদন করছেন। যদিও কারখানাটিতে গত রোববারের পর থেকে গ্যাসের চাপ নেই। ফলে সাড়ে ৩ মেগাওয়াটের গ্যাসচালিত জেনারেটর বন্ধ। পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেল জেনারেটরের বিকল্প ব্যবস্থা দিয়ে কারখানাটির উৎপাদন চালাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক মো. সেরাজুল ইসলাম নথি বের করে দেখালেন, ২২ জুলাই থেকে গ্যাসের চাপ কম। মাঝে গত রোববার কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাসের চাপ ৪-৫ পিএসআই পেয়েছিলেন। তারপর আবার গ্যাসের চাপ শূন্য। গ্যাস না থাকায় দিনে ২০ হাজার থেকে ২১ হাজার লিটার ডিজেল কিনতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে তুসুকা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মাসুম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে গত তিন মাসে ২১ কোটি টাকার জ্বালানি কিনতে হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই খরচ তিন-চার কোটি টাকার বেশি হতো না। এই বিপুল খরচের কারণে লোকসান বাড়ছে বলে মন্তব্য করলেন তিনি।
গাজীপুরে প্রায় ৫ হাজার ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। তার মধ্যে ২ হাজার ৪০০টিতে গ্যাস-সংযোগ রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাত, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক।
গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলে গ্যাস-সংকটের কারণে সুতা উৎপাদনের অধিকাংশ মেশিন বন্ধ রয়েছে। কয়েক দিন ধরে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ। পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেল জেনারেটর দিয়ে এই উৎপাদন হচ্ছে।
জানতে চাইলে এই টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সক্ষমতার ৩০ শতাংশ উৎপাদন করলে উৎপাদন ব্যয় বেশি হয়। এই পরিমাণ উৎপাদন দিয়ে শ্রমিকের বেতন ও ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করে বেশি দিন টিকে থাকা কঠিন।
গ্যাস-সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের মানসিকভাবে সাহস দিতে গতকাল কালিয়াকৈরের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় লিবাস টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে। কারখানার মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করার পাশাপাশি এক কাতারে বসে দুপুরের খাবার খেয়েছেন।
কারখানার শ্রমিকদের উদ্দেশে কর্মকর্তারা বলেন, মনোবল হারানোর কিছু নেই। উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
জানতে চাইলে তিতাসের গাজীপুর শাখার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু গ্যাস পাচ্ছি, তা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি। তবে যেটুকু পাচ্ছি, তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।’
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক কারখানা বিভিন্নভাবে উৎপাদন কার্যক্রমে পরিবর্তন আনছে। তবে কতটি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তা বলা যাচ্ছে না।