পোল্যান্ডভিত্তিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এলপিপি এসএর ঢাকা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ও পুলিশি হয়রানির কারণে বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে তারা। এতে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের (৮ হাজার ৬১০ কোটি টাকা) তৈরি পোশাক আমদানি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দুশ্চিন্তায় আছেন এলপিপির তৈরি পোশাক সরবরাহকারীরা।
এলপিপির কয়েকজন সরবরাহকারী বলেন, এলপিপির মতো বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ স্থগিত করলে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। রাশিয়ার ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এফইএস রিটেইলের দায় এলপিপির ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা যৌক্তিক নয়। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের দাবি, এফইএস রিটেইলের কাছে প্রায় ৪ কোটি ডলারের বকেয়া রয়েছে। যেহেতু এলপিপি কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়তার ভিত্তিতে এফইএস রিটেইলের সঙ্গে ব্যবসা করেছে, সেহেতু তাদের দায় নিতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এফইএস রিটেইলের কাছে বকেয়া আদায়ে দুটি বায়িং হাউসের মালিক গত মাসে এলপিপির ঢাকা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে পৃথক দুটি মামলা করেন। মামলার পর এলপিপির একাধিক কর্মকর্তার বাসায় রাতে পুলিশ অভিযানও চালায়।
তারপর গত ২১ জুলাই এলপিপি তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং বায়িং হাউস মালিকদের সংগঠন বিজিবিএকে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, কয়েক মাস ধরে কিছু বাংলাদেশি কারখানার অর্থ পরিশোধ-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে বিতর্ক চলছে। এসব অর্থ পরিশোধের জন্য তারা প্রকৃত দায়ী পক্ষ নয়। তারপরও তাদের কর্মীরা পুলিশি হয়রানির মুখে পড়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে তারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশে তাদের ক্রয়াদেশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত ৩১ জুলাই বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের চিঠি দিয়ে এলপিপি জানিয়ে দেয়, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য হচ্ছে, আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যার পাশাপাশি গঠনমূলক সমাধানের চেষ্টা সত্ত্বেও উদ্বেগগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। এ জন্য নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া এবং সরবরাহকারীদের কাছে নতুন পণ্য উন্নয়নের কাজ স্থগিত থাকবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে।’
এনসা ক্লথিং নামের একটি বায়িং হাউস গত বছরের এপ্রিলে এফইএস রিটেইলের ক্রয়াদেশের বিপরীতে ৫২ হাজার মার্কিন ডলারের ট্রাউজার রপ্তানি করে। সেই পণ্য রাশিয়ায় পৌঁছায় দুই মাস পর। এফইএস রিটেইল এখন পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করে সেই পণ্য নেয়নি। বকেয়া না পেয়ে এনসা ক্লথিং গত মাসের শেষ দিকে মামলা করে। এতে এলপিপির কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে এনসা ক্লথিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুর দিকে এফইএস রিটেইল ক্রয়াদেশ দিলেও তৈরি পোশাক রপ্তানির পর অর্থ পরিশোধ করত এলপিপি। ফলে তারা কোনোভাবে দায় এড়াতে পারে না। আমরা সব রকম চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পরই মামলা করেছি। কারণ, রপ্তানির অর্থ না পেলে কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।’
এফইএস রিটেইলের কাছে বকেয়া আছে এমন চারজন সরবরাহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এফইএস রিটেইল ক্রয়াদেশ দিয়েছে। তারাই অর্থ পরিশোধ করেছে। বকেয়া অর্থও তারাই দেবে। এ ক্ষেত্রে এলপিপি শুধু এফইএস রিটেইলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে দিতে পারে।
এই চারজন এলপিপিতেও পোশাক সরবরাহ করেন। তাঁরা জানান, বিদায়ী অর্থবছরে এলপিপি ৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক কিনেছে। চলতি অর্থবছরে এলপিপি ৭৭ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক বাংলাদেশ থেকে আমদানি করার পরিকল্পনা করেছে। সে অনুযায়ী তারা ক্রয়াদেশ দিতে শুরু করেছিল।
জানা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় থাকা বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনায় জটিলতার মুখোমুখি হয় এলপিপি। ২০২২ সালের মে মাসে এলপিপি তাদের রাশিয়ার ব্যবসা বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশ থেকে তখন কেসিএস ব্র্যান্ডের নামে রাশিয়ায় পণ্য যেতে শুরু করে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কেসিএসের পরিবর্তে এফইএস রিটেইলকে বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এলপিপি ঢাকা কার্যালয়। এ ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয় তারা। শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও গত বছর থেকে এফইএস রিটেইলের অর্থ পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সব পক্ষের সঙ্গে একাধিক সভা করেছি। আইনগতভাবে এলপিপির কোনো দায় আমরা পাইনি। আশা করি, খুব শিগগির বিষয়টির সমাধান হবে। এলপিপির কর্মকর্তাদের যাতে হয়রানি না করা হয়, সে জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শককে চিঠিও দিয়েছি।’
এলপিপি এসএর বিশ্বের ৪৬টি দেশে ৩ হাজার ৭০০ বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত ৪৩ সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য নেয়, যাদের মধ্যে বায়িং হাউস, তৈরি পোশাক কারখানাও রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ২৫০টি কারখানা এলপিপিকে পোশাক সরবরাহ করে।
এ বিষয়ে ই-মেইলে মন্তব্য জানতে চাইলে এলপিপির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আন্না স্তাশকিয়েভিচ জানান, বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। শিগগির প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।
জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করছেন, তাঁদের আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। হয়তো তাঁরা এলপিপির ভরসায় ব্যবসা করছিলেন। তাই এলপিপির নৈতিক দায় আছে। তবে এলপিপি আমাদের অন্যতম বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান। বিষয়টি সমাধানে উচ্চপর্যায়ের সমঝোতা দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকেরা যাতে রক্ষা পান এবং এলপিপির সোর্সিংও অব্যাহত থাকে। এ ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।’